অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক :
ঢাকার পাইকারি বাজারে চালের দাম কিছুটা কমেছে। চালকল মালিক ও চাল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে খাদ্য ও বাণিজ্যমন্ত্রীর বৈঠকের পর চালের দাম কমেছে। তবে খুচরা বাজারে চড়া দামেই বিক্রি হচ্ছে।
বছরের শুরুতে সারা দেশে সব ধরনের চালের দাম কেজিতে অন্তত দুই টাকা করে বেড়ে যায়। আর সুগন্ধি চালের দাম বাড়ে কেজিতে ৩ টাকা করে। সে সময় দাম বৃদ্ধির জন্য চালকল মালিকদের দায়ী করেছিলেন ঢাকার চাল ব্যবসায়ীরা।
শুক্রবার (১৮জানুয়ারি) রাজধানীর বেশ কয়েকটি চালের বাজার ঘুরে দেখা যায়, ৫০ কেজি ওজনের চালের বস্তার দাম গত ৩-৪ দিনে ৫০ থেকে ৭৫ টাকা কমেছে।
মজুদ তলানীতে ঠেকে যাওয়ার পর এখন চাল আমদানি বাড়াচ্ছে সরকার; চাল আসছে ভারত থেকেও এই প্রেক্ষাপটে গত ৭ জানুয়ারি মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার তিন দিনের মাথায় চালকল মালিক সমিতি ও চাল ব্যবসায়ী সমিতির নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার ও বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি।
চালের বাজারে কোনো অস্থিরতা নেই দাবি করে ওই বৈঠকে চালকল মালিকরা বলেন, মাঝে সাময়িক দাম বৃদ্ধি ছিল ভোটের সময় সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার কারণে।
৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচন ঘিরে সারাদেশে যান চলাচল নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় পণ্য পরিবহনেও কিছুটা সমস্যা দেখা দেয়। এছাড়া ওই সময় সবাই ভোটের মাঠে ব্যস্ততা থাকায় ধান-চালের সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়ে দাম কিছুটা বাড়ে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছিলেন। চালকল মালিক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মন্ত্রীদের বৈঠকের পরের সপ্তাহেই পাইকারী বাজারে চালের দাম কমল।
মাঝে চালের দাম বৃদ্ধির জন্য চালকল মালিকদেরই দায়ী করেছেন পাইকারি ও খুচরা চাল বিক্রেতারা। সরকারের নজরদারির অভাবে মিলাররা ইচ্ছেমতো চালের দাম বাড়িয়ে দেয় বলে অভিযোগ করেন তারা।
উত্তর বাড্ডার মেসার্স খান রাইস এজেন্সির মালিক রিপন হোসেন জানান, জাতীয় নির্বাচনের পর বছরের শুরুতে চালের দাম বস্তাপ্রতি ১০০-১৫০ টাকা বাড়লেও এখন বস্তায় ৫০ টাকা করে কমেছে।
কারওয়ানবাজারে নোয়াখালী রাইস ট্রেডার্সের ম্যানেজার আকরাম হোসেন শাওন জানান, শুক্রবার প্রতি বস্তা মিনিকেট ২৬০০-২৬৫০ টাকা, নাজিরশাইল ২৭০০-২৯০০ টাকা, আটাশ ১৮০০ টাকা এবং স্বর্ণা চাল ১৫০০ টাকায় বিক্রি হয়। সাত দিন আগেও এসব চাল বস্তাপ্রতি ৫০ থেকে ১০০ টাকা বেশিতে বিক্রি হয়েছে।
শাওন বলেন, “বছরের শুরুতে কিছু কিছু মিলার অর্ডারই নেয়নি, ফলে চালের দাম বেড়ে যায়।” বাজারে ধান-চালের ঘাটতি না থাকলেও ‘নজরদারি না থাকায় মিলাররা ইচ্ছেমতো চালের দাম বাড়িয়ে দেয়’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মহাখালী কাঁচাবাজারের জাকির ট্রেডার্সের বিক্রয়কর্মী নূর হোসেন বলেন, গত কয়েক দিনে পাইকারি বাজারে চালের দাম কিছুটা কমলেও খুচরায় গত সপ্তাহের দামেই বিক্রি হচ্ছে। এই বাজারে শুক্রবার প্রতি কেজি মিনিকেট ৫৫ টাকা, নাজিরশাইল ৫৬-৬৫ টাকা এবং আটাশ ৪৩-৪৪ টাকায় বিক্রি হওয়ার তথ্য জানান বিক্রেতারা।
মেরুল বাড্ডা ডিআইটি প্রোজেক্টে ফজলুল হক নামের একজন খুচরা বিক্রেতা শুক্রবার জানান, খুচরায় প্রতি কেজি মিনিকেট ৫৫-৫৬ টাকা, নাজিরশাইল ৬০-৬২ টাকা, বিআর আটাশ ৪২-৪৪ টাকা এবং পাইজাম ৪০-৪২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ফজলুল হক বলেন, পাইকারিতে চালের দাম প্রতি বস্তায় ৫০ টাকা করে কমলেও খুচরায় কমেনি। কারণ ৫০ কেজির বস্তায় ৫০ টাকা কমার পর কেজিতে এক টাকা করে কমিয়ে বিক্রি করলে কোনো লাভই থাকবে না। কেজি কেজি করে বিক্রি করলে ৫০ কেজি চাল পাওয়া যায় না।
বাংলাদেশ অটোমিল অ্যান্ড হাস্কিং ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক লায়েক আলী শুক্রবার লেন, “ভোটের পরে চালের চাম যেটুকু বেড়েছিল তা কমে গেছে। চালের দাম এখন স্বাভাবিক।
“তবে যে হারে ধানের দাম কমছে তাতে কৃষকরা হতাশ।” বাজারে বর্তমানে আমন ধান সাড়ে ৬০০ থেকে পৌনে ৭০০ টাকা মন বিক্রি হচ্ছে জানিয়ে লায়েক বলেন, কমপক্ষে সাড়ে ৭০০ টাকা মণ ধান বিক্রি করতে না পারলে কৃষক বাঁচবে না, সেই দিকেও সবার নজর দেওয়া উচিত।
মিলাররা পাইকারি বিক্রেতাদের ঠিকমতো চাল সরবরাহ করছে জানিয়ে তিনি বলেন, “ভোটের সময় নানা কারণে একটু গ্যাপ পড়ে গিয়েছিল এটা ঠিক। এখন সব কিছু ঠিকঠাক আছে।”
খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি গুদামে বর্তমানে ১৪ লাখ টন খাদ্যশস্য মজুদ আছে। এরমধ্যে ১২ লাখ ৩৮ হাজার টন চাল এবং এক লাখ ৬২ হাজার টন গম।
মজুদ পরিস্থিতির হালনাগাদ তথ্য খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে এফপিএমইউ বলেছে, “মজুদ সন্তোষজনক, মাসিক চাহিদা ও বিতরণ পরিকল্পনার তুলনায় পর্যাপ্ত খাদ্যশস্য মজুদ রয়েছে। এ মুর্হূর্তে খাদ্যশস্যের কোনো ঘাটতি নেই বা ঘাটতির কোনো সম্ভাবনা নেই।”
রাজধানীতে আয়ত্তের মধ্যে সবজির দাম
শীত মানেই সবজির সমারোহ। বাহারি আইটেমের সবজি থাকবে বাজারে আর ক্রেতারা পছন্দ মতো তা কিনবে এটাই স্বাভাবিক শীত মৌসুমের চিত্র। বর্তমানে রাজধানীর কাঁচাবাজারগুলোতে এ চিত্র চোখেও পড়েছে। শিম, ফুলকপি, বাঁধাাকপি, শালগম, মুলা, বেগুন, টমেটো, গাজরসহ শীতের সবজিতে ভরপুর রয়েছে রাজধানীর কাঁচাবাজারগুলো। বিভিন্ন প্রকার সবজির এমন সরবরাহে অধিকাংশ সবজির দাম রয়েছে ক্রেতাদের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে। বাজারে ঘুরে চোখে পড়েছে বিভিন্ন প্রকারের শিম, বিভিন্ন আইটেমের কপি, রয়েছে বিভিন্ন এলাকার বেগুন, রয়েছে রং বেরঙয়ের টমেটো। তাছাড়াও বিভিন্ন দোকানে শোভা পাচ্ছে চাইনিজ বিভিন্ন আইটেমের সবজি। সবজির পাশাপাশি পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ, নতুন আলুর দামও রয়েছে আয়ত্তের মধ্যে।
সেই সঙ্গে সপ্তাহের ব্যবধানে কিছুটা কমেছে ডিমের দাম। আর দাম অপরিবর্তিত রয়েছে মুরগি, খাসি ও গরুর মাংসের। তবে দামি সবজির তালিকায় রয়েছে বরবটি, করলা ও লাউয়ের দাম। গত সপ্তাহের তুলনায় এ সপ্তাহে লাউয়ের দাম একটু কমলেও বরবটি ও করলার দাম রয়েছে আপন তবিয়তে। গতকাল রাজধানীর কারওয়ান বাজার, যাত্রাবাড়ী, শ্যামবাজার, রামপুরা, মালিবাগ হাজীপাড়া, খিলগাঁওয়ের বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা যায়, বর্তমানে বাজারে সব থেকে দামি সবজির তালিকায় রয়েছে করলা। বাজার ও মানভেদে করলার কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৭০ টাকায়, এক সপ্তাহ আগেও এ সবজির দাম একই ছিল। করলার পরই রয়েছে লাউ। বাজার ও মানভেদে লাউ বিক্রি হচ্ছে ৩৫ থেকে ৬০ টাকায়। যা গত সপ্তাহে ৫০ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এ সপ্তাহে মানভেদে লাউয়ের দাম ১৫ থেকে ২০ টাকা কমেছে। বাজারে সাশ্রয়ী মূল্যে পাওয়া যাচ্ছে ফুলকপি, বাঁধাকপি, মুলা, শালগম, বেগুন, পেঁপে, শিম। শিম বাজার ও মানভেদে ১৫ থেকে ৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। সিলেট থেকে আসা বড় আকৃতির শিম বিক্রি হচ্ছে ৩০-৪০ টাকা কেজিতে। এছাড়া অন্যান্য শিম বিক্রি হচ্ছে ২০-২৫ টাকা কেজি। গত সপ্তাহে দাম ছিল ৩০ থেকে ৫০ টাকা। মানভেদে বেগুনের কেজি বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ৩০ টাকা। ফুলকপি ১০ থেকে ২৫ টাকা পিস, বাঁধাকপি ১৫ থেকে ২৫ টাকা পিস, শালগম ১০ থেকে ২০ টাকা কেজি এবং মুলা ১০ থেকে ২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। গত সপ্তাহেও একই দামে বিক্রি হয়েছে এসব সবজি। সপ্তাহের ব্যবধানে কিছুটা দাম কমার তালিকায় রয়েছে- পাক টমেটো ও নতুন আলুর।
পাকা টমেটোর কেজি বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ৪০ টাকা। কাঁচা টমেটো বিক্রি হচ্ছে ২৫ টাকা কেজিতে। পাকা টমেটো বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৪০ টাকা কেজি। গত সপ্তাহে এ সবজির কেজি বিক্রি হয় ৩০ থেকে ৪০ টাকায়। নতুন আলুর দাম কেজিতে ৫ টাকা কমে ২০ থেকে ২৫ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। দাম অপরিবর্তিত রয়েছে পেঁয়াজ ও কাঁচামরিচের। আগের সপ্তাহের মতো নতুন দেশি পেঁয়াজ ২০ থেকে ২৫ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। আর আমদানি করা ভারতীয় পেঁয়াজের কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৫ থেকে ২০ টাকায়। কাঁচামরিচের পোয়া (২৫০ গ্রাম) বিক্রি হচ্ছে ১৫ থেকে ২০ টাকা। এছাড়াও মটর বিক্রি হচ্ছে ৫৫ টাকা কেজি, পেঁয়াজ পাতা ২০ টাকা কেজি, গাজর ২০ টাকা কেজি, লেবু ৩০ টাকা হালি, ধনে পাতা ৪০ টাকা কেজি এবং লতা বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা কেজিতে।
অন্যদিকে পালন শাক ৫ থেকে ১৫ টাকা আঁটি, লাল ও সবুজশাক ৫ থেকে ১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। লাউ শাক পাওয়া যাচ্ছে ২০ থেকে ৩০ টাকায়। সরিষা শাক ৫ থেকে ১০ টাকা আটি বিক্রি হচ্ছে। সবজির দামের বিষয়ে খিলগাঁওয়ের ব্যবসায়ী সজিব হোসেন বলেন, এখন সব ধরনের সবজির দাম কম। ১০০ টাকা কেজির ওপরে বিক্রি হওয়া গাজর, টমেটো এখন মাত্র ২৫ টাকায়। বাজারে ভরপুর শীতের সবজি থাকায় দাম এখন কম। যাত্রাবড়ী আড়তে দেখা যায়, শুধু ডিম বিক্রি করেন এমন ব্যবসায়ীরা এক ডজন ডিম বিক্রি করছেন ৯০ থেকে ৯৫ টাকায়। আর এক হালি ডিমের দাম রাখা হচ্ছে ৩২ টাকা।
গত সপ্তাহে এ বাজারে ডিমের ডজন বিক্রি হয়েছে ১০০ থেকে ১০৫ টাকা। ডিমের দামের বিষয়ে হাজীপাড়া বৌ-বাজারের ব্যবসায়ী মো. সোবহান মিয়া বলেন, এক সপ্তাহ আগে এক ডজন ডিম বিক্রি করেছি ১০০ টাকায়। এখন সেই ডিম ৯০ টাকায় বিক্রি করছি। অবশ্য মাসখানেক আগে ডিম ৮৫ টাকা ডজন বিক্রি হয়েছে। কিন্তু ভোটের আগে হঠাৎ দাম বেড়ে ১০০ টাকা হয়। শ্যামবাজারে সবজি কিনছেন মিলন মিয়া, তিনি বলেন বর্তমানে সবজির দাম একটু কম রয়েছে। যে কারণে আমরা সবজি একটু বেশি কিনছি।