বিশেষ সম্পাদকীয় :
আমি করবো আওয়ামীলীগ আর তোরা করবি হাজারী লীগ; এমন কথা নাকী এক সময় ফেনীর জয়নাল হাজারী বলতেন। অর্থাৎ তোরা কেউ আওয়ামীলীগ করার দরকার নেই, তোরা সব আমার লীগ করলেই হবে। দৃশ্যমান এমন রাজনীতি এখন দেখা না গেলেও প্রায় জেলা, উপজেলা বা ইউনিয়নে এমন রাজনীতির চর্চা হচ্ছে আওয়ামীলীগে। ফেসবুকে দেখা যায়, অমুক ভাই আমাদের শেষ ঠিকানা; অথচ অমুক ভাই তো শেষ ঠিকানা হওয়ার কথা নয়। শেষ ঠিকানা হবে-বঙ্গবন্ধুর আদর্শ আর শেখ হাসিনার নেতৃত্ব।
পরীক্ষাকেন্দ্রে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে দেয়ার পর থেকে একের পর এক সন্ত্রাসী ও সন্ত্রাসীর অভিভাবকদের পরিচয় দিয়ে যাচ্ছেন ফেনীর নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট সোহেল রানা। নুসরাতকে আগুন দেয়ার পর ১১ এপ্রিল নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট সোহেল রানা লিখেছেন- হত্যাকারীদের বাঁচানোর চেষ্টা করল কারা? কারা এটাকে অত্মহত্যা বলে চালানোর চেষ্টা করল? কারা হত্যাকারীদের পালাতে সহায়তা করল? কোন অদৃশ্য হাত লম্পট অধ্যক্ষকে বাঁচানোর চেষ্টা করল? এখনো কারা ষড়যন্ত্রকারীদের আশ্রয় দিয়ে রেখেছে?
এগুলো লিখতে পারবেন সাংবাদিক ভাইয়েরা! লিখুন, এদের বিচার ছাড়া আপনারা বিচার মানবেন না! আপনাদের সাথে তো প্রধানমন্ত্রীও আছেন। লিখুন এই অদৃশ্য হাতই অনেক অপরাধের মূল নিয়ন্ত্রক! এই অদৃশ্য হাতের বন্ধনে সবার হাত আবদ্ধ। অথচ এ হাত কিছুই না, চোখের নিমিষে ছুড়ে ফেলা যায়। লিখুন- আপনার প্রজ্ঞা, সততা আর সাহস দিয়ে। আফসোস বুদ্ধিহীন, অসৎ আর কলিজাহীন শকুনগুলোর জন্য। আফসোস এদের অভিনয় সর্বস্ব জীবনের জন্য। ম্যাজিষ্ট্রেট সোহেল রানার এই লেখায় দুই হাজারের উপরে লাইক, কয়েক শত শেয়ার ও কমেন্টস পড়তে দেখা গেছে।
গত ১১ এপ্রিল ফেনীর সাংবাদিকদের উদ্দেশ্য করে আরেকটি লেখা লিখেছেন সোহেল রানা। এতে তিনি লিখেছেন- ইতিহাস নিজহাতে লিখেন! সাংবাদিক ভাইয়েরা বলে দেন, কার হুকুমে মামলা নিয়ে নয়ছয় হলো? কারা অধ্যক্ষকে সমর্থন করেছে? কারা হত্যাকারীকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছে। একেবারে গোড়াসহ লিখেন। ওসির ওই ব্যবহারের পেছনে কে বা কারা কাজ করেছে? কারা মূলত মদদদাতা আর কারা তাদের বাঁচাতে চায়। নুসরাত দিয়েই শুরু হোক। ভবিষ্যতের ইতিহাস লিখেন। নুসরাত আগুনে পোড়ার দিনগুলো লম্বা হলো, কিন্তু ফেনীর কোনো সাংবাদিক সত্য ঘটনা লিখেনি। অবশেষে মুখ খুললেন ফেনীর ওই ম্যাজিস্ট্রেট! সন্ত্রাসী কারা? আর সন্ত্রাসীদের ছায়াদানকারী কারা, তাদেরও পরিচয় তুলে ধরলেন তিনি।
একজন সাহসী ম্যাজিষ্ট্রেট সোহেল রানা একাই অনেক কিছু করলেন- নুসরাত হত্যাসহ সকল অপরাধের বিরুদ্ধে। সাহস নিয়ে বেঁচে থাকার সময় এসেছে। বাঁকা পথের ক্ষুদ্র স্বার্থ ত্যাগ করার সময় এসেছে। অন্যায়কারীদের ছুড়ে ফেলার সময় এসেছে। সত্যিকারের সংবাদকর্মী বা সাংবাদিক হওয়ার সময় এসেছে। আমরা কোন স্বার্থে আর কতদিন চুপ থাকবো। একটি জনপদে আর কত অপরাধ হলে সাংবাদিকরা চোখ খুলবেন? রাষ্ট্রযন্ত্রের নীতি বিরোধী আমরা নই। তবে; সমাজের ছোট-বড় অপরাধগুলো কমাতে আমরা সহায়তা করতে পারি। সাধারণ মানুষকে আমরা সাহস যোগাতে পারি।
রাজনীতিতে পদবিধারীদের নেতৃত্ব মেনে কাজ করাই কর্মীদের দায়িত্ব এবং নীতি হওয়া উচিৎ। কিন্তু এমন নেতৃত্ব মানা উচিৎ নয়, যেখানে দলের আদর্শ বিচ্যুত হতে হয়। সর্বক্ষেত্রে একটি চেইন অব কমান্ড থাকতে হয়। থাকতে হয় আইন কাঠামোর ভিত্তি। রাজনীতিতে ফাউল খেলে যারা মনে করেন তারা ভালো খেলোয়ার, তাদের জন্য উপহাস হয়। অনেকক্ষেত্রে ফাউল খেলোয়াররা জয়লাভ করে, কিন্তু তিনি কখনও বলতে পারবেন না তিনি একজন ভালো খেলোয়ার। সমাজে যে যেই অবস্থানে কাজ করেন, তাকে সেই অবস্থানে কাজ করতে দেয়া উচিৎ। সব জায়গায় নিয়ন্ত্রণের হাত বাড়ানো উচিৎ নয়। তাহলে; কাজের ক্ষেত্র ও পরিবেশ নষ্ট হয়। সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। সৃষ্টি হয় জনঅসন্তোষ। যার ফলে সমাজে অশান্তি বিরাজ করে।
ক্ষমতার মোহে অনেকের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ বেড়ে গেছে। হারিয়ে ফেলেছে হিতাহিত জ্ঞান। বাড়াবাড়ি করা হচ্ছে সর্বক্ষেত্রে। বাড়তে বাড়তে এখন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকেও থোড়াই কেয়ার করা হচ্ছে। এসবের প্রতিকার রাষ্ট্রনায়ক জননেত্রী শেখ হাসিনাকেই করতে হবে। না হলে সমাজ হয়ে পড়বে অপরাধীদের অভয়ারন্য।
পাদটিকা :
বাংলা বা ইংরেজী যাই হোক, নতুন বছর এলে আমরা সবাইকে শুভ নববর্ষ বলে শুভেচ্ছা জানাই। বছরটি কতটা শুভ বা অশুভ হবে তা কিন্তু আমরা কেউই জানিনা। ভবিষ্যৎ জানার একমাত্র তাঁর ক্ষমতা যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি মহান আল্লাহ।
তবে পৃথিবীতে বা দেশে দেশে যত অন্যায়-অবিচার আছে তার জন্য দুনিয়াতেও মানুষকে শাস্তি বা অশান্তি ভোগ করতে হয়। কখনও কখনও আমাদের জীবনে যে অশুভ ছায়া ভর করে তা আমাদেরই হাতের কামাই।
কথায় আছে- অন্যায় যে করে, আর অন্যায় যে সহে দুজনেই সমান অপরাধী। আমাদের সমাজে অন্যায়কারীদের চেয়ে অন্যায় সহ্যকারী লোকের সংখ্যা বেশি। এখানে মানুষ না বলে লোক বলেছি এই কারণে, কারণ মানুষ হলে অন্যায় সহ্য করবে কেন?
মানুষের জীবনে অর্থনৈতিকভাবে কারো হলো প্রয়োজন আর কারো হলো বিলাসিতা। প্রয়োজন মিটানো সম্ভব কিন্তু বিলাসিতা বা চাহিদা মিটানো সম্ভব নয়।
তাই, নতুন বছরে শুভ বললেই শুভ হয়ে যাবেনা, আবার অশুভ বললেই অশুভ হয়ে যাবেনা। প্রয়োজন অলীক চাহিদার পরিবর্তন, প্রয়োজন অন্যায় মানসিকতার পরিবর্তন। সবার জন্য শুভ কামনা রইল। শুভ বাংলা নববর্ষ।
মো. আলী হোসেন, সাংবাদিক ও লেখক
ahossain640@gmail.com