আকাশবার্তা ডেস্ক :
‘র্যাগিং’ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে শব্দটির সাথে পরিচিত নন এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যা নেহাতই কম। প্রতিটি শিক্ষার্থী স্বপ্ন দেখে সুশিক্ষা গ্রহণ করে প্রতিষ্ঠিত হয়ে পরিবারের হাল ধরবে আর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের আশা নিয়েই স্কুল-কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে ভর্তি হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে।
কিন্তু সদ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের কাছে পাঠ্যসূচি, শিক্ষক বা আনুষঙ্গিক বিষয়াদি নয় বরং সবচেয়ে বড় ভয়ের বিষয় হিসেবে আবির্ভূত হয় যেটি, সেটি হলো র্যাগিং। নতুন ভর্তি হওয়া এসব শিক্ষার্থীদের স্বপ্নগুলোতে ক্ষত তৈরি করে তোলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু সিনিয়র শিক্ষার্থীরা।
ক্যাম্পাসে নতুন শিক্ষার্থীদের চলতে-ফিরতে বিভিন্ন জায়গায় মুখোমুখি হতে হয় সিনিয়রদের দ্বারা ভয়াবহ র্যাগিংয়ের। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে র্যাগিং একটি অলিখিত বিষয়। শুধু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নয় র্যাগিংয়ের ব্যাপকতা ছড়িয়ে পড়েছে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়েও।
বিশ্ববিদ্যালয়ে র্যাগিং এর কোনো ধরা বাধা বিধান না থাকলেও কিন্তু নতুন ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই এই টামের সাথে পরিচিত হতে হয়। ভতি পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগইে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিস র্যাগিং ও সকল ধরণের অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে নোটিশ দিয়ে থাকে। যাতে নতুন ভর্তিচ্ছুদের সাথে কেউ খারাপ আচরণ করার সাহস না দেখায়।
তারপরেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে র্যাগিং সংস্কৃতি বিলুপ্ত হচ্ছে না। র্যাগিংয়ের ফলে কেউ কেউ মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে, কেউ আবার অপমানে আত্মহত্যার চিন্তাভাবনাও করে। উদ্বেগের বিষয় হল যুগ যুগ ধরে চলে আসা র্যাগিং নামক এই অপসংস্কৃতি বিরুদ্ধে আজো কোনো কঠোর ব্যাবস্থা নিতে দেখা যায়নি এমনকি র্যাগিং বন্ধে এখন পর্যন্ত তৈরি হয়নি কোন আইন।
প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েই নিজস্ব প্রশাসন আছে কিন্তু তাদের পক্ষ থেকেও এই ভয়াবহ র্যাগিং কালচার বন্ধে কোনো সুস্পষ্ট আইন নেই। প্রথম বর্ষে যে মুখ বুজে র্যাগিং সহ্য করে, এবং এক বছরের সিনিয়র হয়ে যাওয়ার পর তারা নিজেরাও জুনিয়রদেরকে র্যাগ দিতে শুরু করে। এভাবেই র্যাগিংয়ের বিস্তার ঘটছে যুগ যুগ ধরে।
বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের হত্যার পরেই আলোচনা আসে র্যাগিংয়ের বিষয়টি আবরারকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে এভাবেও র্যাগিং দিতে দেখা যায় বিভিন্ন সময়ে। তবে আবরারকে যে র্যাগিং করে হত্যা করা হয়েছে সেটাও নিশ্চিত নয়। তবে আবরার কে র্যাগিং করে হত্যা করা হতে পারে এমন ধারণা থেকেই বুধবার বিশ্ববিদ্যালয়ে র্যাগিং বন্ধ ও এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছেন সুপ্রিমকোর্টের এক আইনজীবী। নোটিশে স্বরাষ্ট্র সচিব, শিক্ষা সচিব ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যানকে র্যাগিং বন্ধে সাত দিনের মধ্যে সুনিদৃষ্ট আইন তৈরি ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।
র্যাগিং আসলে কী?
র্যাগিং হলো বিশ্ববিদ্যালয় বা উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে প্রচলিত এমন একটি ‘পরিচিতি বা দীক্ষা পর্ব’, যার মূল লক্ষই থাকে প্রবীণ শিক্ষার্থী কর্তৃক নবীন শিক্ষার্থীদেরকে বিভিন্নভাবে হেনস্তা করা। একাধারে যেমন তাদেরকে মৌখিক গালিগালাজ করা হয় (বাবা-মা তুলে, যে জেলা থেকে এসেছে সেই জেলাকে হেয় করে), বিভিন্ন অপমানজনক কাজ করতে বাধ্য করা হয়, বিভিন্ন দুঃসাহসী কাজ করতে বলা হয় (যেমন- সিনিয়র কাউকে ভালোবাসার প্রস্তাব দেয়া, শীতের রাতে পুকুরে নেমে গোসল করে আসা ইত্যাদি), তেমনই সরাসরি তাদের গায়ে হাতও তোলা হয়। এগুলোকেই মুলত র্যাগিং হিসাবে বিবেচিত।
র্যাগিংয়ের ভয়াবহতা ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে সম্প্রতি যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) প্রথম বর্ষেও ন্যূনতম ১২ জন শিক্ষার্থীকে র্যাগিং ও অসামাজিক কাজে বাধ্য করার অপরাধে ৯ ছাত্রকে বহিষ্কৃত করা হয়েছে। তাদের মাঝে দুইজন আজীবন, একজন দুই বছর এবং ছয়জন এক বছরের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত হয়েছে। এবং এই ঘটনায় পরোক্ষভাবে জড়িত থাকার অপরাধে অপর দুই ছাত্রকে সতর্ক করা হয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র র্যাগিং এর শিকার হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়েছে।
শুধু যশোরই নয় চলতি বছরের মার্চে গোপালগঞ্জে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২ ঘন্টা যাবৎ র্যাগিংয়ের নামে মানসিক ও শারীরিক অত্যাচার চালানো হয় প্রথম বর্ষের দুই শিক্ষার্থীর ওপর।
পরে এটার ভিডিওচিত্রও ধারণ করে অনলাইনে ছড়িয়ে দেয়া হয়। ফলে সেটি ভাইরাল হয়। পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দ্বিতীয় বর্ষের ছয়জন শিক্ষার্থীকে চিহ্নিত করে এবং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাদের বহিষ্কার করা হয়।
একই ঘটনা ঘটে রাজশাহীতেও বড় স্বপ্ন নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল ফাহাদ। কিন্তু নবাগত হওয়ায় র্যাগিংয়ের নামে সিনিয়ররা তার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালায়।পরে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
গত বছর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মিজানুর রহমান র্যাগিংয়ের শিকার হয়ে অনেকদিন ট্রমায় ছিলেন। মিজান এমন অসুস্থ হয় তার মা বাবাকে পর্যন্ত চিনতে পারেনি।
দেশের বাহিরে র্যাগিং কালচার সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ও যুক্তরাষ্ট্রের নর্থদামটন কমিউনিটি কলেজের শিক্ষার্থী সাজ্জাদ হোসাইন বলেন , র্যাগিং আসলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একটি বাজে সংস্কৃতি বা অভ্যাস।
‘র্যাগিং’ নামে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে একধরণের সহিংসতা নীরবে-নিভৃতই চলে আসছে। কুৎসিত ও নিষ্ঠুর আচরণের মাধ্যমে নবাগত শিক্ষার্থীদের ‘অভ্যর্থনা’ জানানোর নামই হলো ‘র্যাগিং’।
যুক্তরাষ্ট্রেও কমবেশি র্যাগিং হয় তবে ওদের র্যাগিংয়ের ধরণ ভিন্ন ওরা সাধারনত দুষ্টমির ছলে র্যাগিং করে থাকে সেটা দেখা যাবে হটাৎ আপনার মাথায় খোঁচা দিয়ে চলে যাবে না হয় আপনার সামনে এসে পরিচয় ছাড়াই দাড়িয়ে কথা বলবে। অনেকটা প্রাঙ্ক এর মত। বাংলাদেশের মত র্যাগিংয়ের নামে এমন শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এখানে করে না।
স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তপন মাহমুদ লিমন বলেন, র্যাগিং বিষয়টাকে আমি দেখি ছাত্র অধিকার ও মানবিক মর্যদার পরিপন্থি কাজ হিসাবে। কারণ প্রতিটি মানুষেরই তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একটা সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার আছে।
কোনোভাবেই কারোর উপর কখনো ছোট ভাই বলে কর্তৃত্ব ফলানো সমিচিন নয়। যারা বিভিন্ন অজুহাতে র্যাগ দেয় সেটা তারা নিছক বিনোদন মনে করলেও আমি এটা অপরাধ হিসাবেই দেখি। আমি কখনোই মানুষকে এভাবে হ্যায় প্রতিপন্ন করে র্যাগিং দেয়ার পক্ষে নই। আসলে বিভিন্ন সময় র্যাগিংয়ের বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া হয় কিন্তু সেটা পর্যাপ্ত নয়। ১০০ টা র্যাগিংয়ের ঘটনা ঘটলে একটার পদক্ষেপ নেয়া সেটা যোক্তিক না। আসলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনও যথেষ্ট শক্তিশালী না তাই তারা ইচ্ছে করলেও র্যাগিংয়ের বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে পারে না।
বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা ছেলের কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠা এবং দাদাগিরী বা বড়ভাই ভাব নেয়া এটা শুরু হয় র্যাগিংয়ের মধ্য দিয়েই। আবরার হত্যাকান্ডের সাথে র্যাগিংয়ের সরাসরি সম্পৃক্ততা থাকুক বা না থাকুক খোঁজ নিয়ে দেখবেন তারা একটা সময় র্যাগ দিতো ঔই অভ্যাসগুলোর থেকেই হয়তো এই হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে।
আগে যেটা হয়েছে সেটা বাদ দিয়ে এখন থেকে র্যাগিং বন্ধে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদেরও অধিকতর সচেতন হওয়া উচিত এবং যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া উচিত যেন একই ঘটনার আর পুর্নরাবৃত্তি না হয়। এতোদিন র্যাগিং বন্ধে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পর্যাপ্ত ব্যাবস্থা ছিলনা যদি থাকতো তাহলে এটা এতোদিনে বন্ধ হয়ে যেত। এখন র্যাগিং বন্ধে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন ও শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের একটা আইন করা উচিত আর আইন না করলে র্যাগিং আরো বাড়বে এটার ভয়াবহতা থেকে শিক্ষার্থীদেও রক্ষা করা সম্ভব নয়।
র্যাগিং বন্ধে কি ধরণের পদক্ষেপ দরকার জানতে চাওয়া হলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান বলেন, র্যাগিং এর ভয়াবহতা জানা সত্ত্বেও এটার বিষয়ে আইন তৈরির বিষয়ে উদাসীন হলে হবে না। প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের সার্বক্ষণিক সহায়তায় জন্য এন্টি র্যাগিং কমিটি গঠন এবং মনিটরিংয়ের জন্য এন্টি র্যাগিং স্কোয়াড গঠনে সাত দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে।
এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা ছেলে র্যাগিংয়ের কারণে আত্মহত্যা করেছিলো তারপর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র র্যাগিংয়ের শিকার হয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলো কিন্তু সে বিষয়ে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক এবি এম নাজমুল সাকিব বলেন, একটা সময় র্যাগিংয়ের যে ধারণা ছিলো বর্তমানে তা নেই। তখন র্যাগিং মূলত সিনিয়র-জুনিয়রদের মধ্যে পারস্পারিক সৌহার্দপূর্ণ একটি সম্পর্ক তৈরি করতো। কিন্তু বর্তমানে র্যাগিংয়ের নামে ক্ষমতা প্রদর্শনের একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যা রীতিমতো ভীতিকর। র্যাগিংয়ের শিকার শিক্ষার্থী এমন একটি ট্রমার মধ্য দিয়ে যায়।
যার কারণে তার একাডেমিক জীবন, ব্যাক্তি জীবন, এমনকি পারিবারিক জীবনেও ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ফলে অনেকেই অস্বাভাবিক জীবন-যাপন করে। আমি শিক্ষক হিসেবে র্যাগিংয়ের বর্তমান অবস্থার অবসান চাই। একই সাথে সুস্থ সাংস্কৃতিক পরিবেশ চাই। যার মাধ্যমে সিনিয়র-জুনিয়রদের মধ্যে শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার সম্পর্ক তৈরি হবে।
সূত্র : দৈনিক আমার সংবাদ