আকাশবার্তা ডেস্ক :
জাহিদ হাসান জাহিদ। চাকরি করতেন ঢাকার গুলিস্তান হল মার্কেটের মুক্তা ইলেকট্রনিক্সে। গত ১৭ জানুয়ারি মার্কেট বন্ধ থাকায় ওইদিন বিকেলে বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে ঘুরতে বের হন। ঘুরাফেরা শেষে বন্ধু-বান্ধবরা যে যার বাসায় ফিরলেও ফেরেননি জাহিদ। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও তাকে না পাওয়ায় পুলিশের দ্বারস্থ হয় পরিবার।
এরপর বাসা থেকে বের হওয়ার পাঁচদিনের মাথায় পুলিশ শীতলক্ষ্যা নদীর বুক থেকে উদ্ধার করে জাহিদের লাশ। প্রক্রিয়া অনুযায়ী হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে জাহিদও বাসায় ফিরে লাশ হয়ে।
কিন্তু কেন জাহিদের এমন মৃত্যু, কেন তার সঙ্গীয় বন্ধু-বান্ধরা অক্ষত অবস্থায় বাসায় ফিরলেও জাহিদ ফিরতে পারেননি তার অনুসন্ধান করছে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা পুলিশ। পুলিশ এখনো পর্যন্ত তদন্ত শেষ করতে পারেনি, চলমান থাকায় সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে কোনো তথ্যও দেয়নি।
তবে জাহিদের বাবা আমির হোসেন জানিয়েছেন, বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে পার্টিতে গিয়েই খুন হয়েছে জাহিদ।
খুনের এ ঘটনায় জাহিদের বাবার করা সাধারণ ডায়েরি ও মামলা সূত্রে জানা যায়, ঢাকার গুলিস্তান হল মার্কেটের মুক্তা ইলেকট্রনিক্স ও মোবাইল এক্সেসরিজের দোকানে চাকরি করত জাহিদ। প্রতিদিন সকাল ৮টায় বাসা থেকে বের হয়ে রাত ১০টায় দোকান থেকে বাসায় ফিরতো।
এরই মধ্যে গত ১৭ জানুয়ারি মাকের্ট বন্ধ থাকায় ওই দিন বিকেলে জাহিদ তার বন্ধু বিজয়, মৃদুল, ইমন, সিফাত, শাহেদ, আলামিন, বান্ধবী তুলি ও জান্নাতসহ অজ্ঞাত আরও তিন-চারজনের সঙ্গে ঘুরতে বের হন।
ওইদিন থেকেই জাহিদের আর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। পরিবার ও স্বজনরা বহু খোঁজাখুঁজি করেও না পেয়ে নিখোঁজ উল্লেখ করে ডেমরা থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। যার নম্বর-৭২৩। এরই মধ্যে ঘুরাফেরা শেষে বাসায় ফেরা জাহিদের বন্ধু-বান্ধবদের কাছে জাহিদের বিষয়ে জানতে চাইলে তারা জাহিদ সম্পর্কে সন্দেহজনক কথাবার্তাও বলে।
এদিকে সাধারণ ডায়েরির তিন দিনের মাথায় জাহিদের বড় ভাই বাপ্পীর মুঠোফোনে জাহিদের লাশ উদ্ধারের সংবাদ জানায় সিদ্ধিরগঞ্জ থানা পুলিশ।
পুলিশ জানায়, জাহিদের লাশ সিদ্ধিরগঞ্জ থানাধীন শিমরাইল তাজ জুটমিলের ঘাটে শীতলক্ষ্যা নদীর পানিতে ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার করে সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করে এবং নারায়ণগঞ্জের ভিক্টোরিয়া জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠায় বলেও জানায়।
এমন সংবাদ পেয়েই তাৎক্ষণিক জাহিদের বাবা, বড় ভাই ও স্বজনরা ভিক্টোরিয়া জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে লাশ শনাক্ত করেন এবং তারা দেখতে পান, জাহিদের মাথার ডান পাশে ফুলা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে পচন ধরে চামড়া উঠে গেছে।
এরপরই তিনি সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় এ ঘটনায় অপমৃত্যু মামলা করেন। যার নম্বর- ০৫/২০। পরবর্তীতে ৮ ফেব্রুয়ারি জাহিদের ময়না তদন্তের প্রতিবেদন হাতে পায় জাহিদের পরিবার।
ময়না তদন্ত প্রতিবেদনে নারায়ণগঞ্জের ভিক্টোরিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক মো. আসাদুজ্জামান ‘ভারী আঘাত ও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মৃত্যু’ হয়েছে বলে জানান।
ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জাহিদের পরিবার ধারণা করে, পূর্বপরিকল্পিতভাবেই জাহিদকে তার বন্ধু-বান্ধবরা ওই দিন (ঘুরতে যাওয়া) হত্যা করে লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দেয়।
জানতে চাইলে জাহিদের বাবা গতকাল বলেন, এ পর্যন্ত পুলিশ বিজয়, সিফাত, তুলি, ইমন, মৃদুল নামে জাহিদের পাঁচ বন্ধু-বান্ধবকে গ্রেপ্তার করেছে।
এর মধ্যে মূল আসামি ইমনকে ১০ ফেব্রুয়ারি যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে যাত্রীবাড়ী থানা পুলিশ। ইমন দক্ষিণ যাত্রাবাড়ীর ওয়াপদা কলোনির বাসিন্দা।
তিনি বলেন, আলামিন জাহিদের দুই হাতসহ শরীর জড়িয়ে ধরে, ইমন পাথর দিয়ে জাহিদের মাথায় ও শরীরে আঘাত করে খুন করে। সেই আলামিন ও আরেক বান্ধবী জান্নাত এখনো পলাতক রয়েছে।
এছাড়া গ্রেপ্তার তুলির বিষয়ে আমির হোসেন জানান, তুলি ইডেন কলেজের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিদ্ধিরগঞ্জ থানার অপারেশন্স অফিসার রুবেল হাওলাদারের কাছে জানতে চাইলে বলেন, এ ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে মামলা তদন্তের স্বার্থে কোনো তথ্য দেয়া যাচ্ছে না। তদন্ত চলমান রয়েছে।
তুলির সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, শুনেছি তুলি ইডেন কলেজের ছাত্রী। তবে এখনো ইডেনে খোঁজ নেয়া হয়নি।
এছাড়া জাহিদের লাশ উদ্ধারের দিন পুলিশের করা সুরতহাল প্রতিবেদনে দেখা যায়, জাহিদের মাথার ডান পার্শ্বে ফুলা, কপালের ডান পাশে, চোখের নিচে, নাকের উপরেসহ মুখমণ্ডলের বিভিন্ন জায়গায় পানিতে পচন ধরার কারণে চামড়া উঠানো ঠোঁট ফুলা ও খোলা দাঁত দেখা যায়।
দুই হাতের আঙ্গুলের চামড়া মাংস থেকে আলাদা হয়ে গেছে। পেটে, নাভীর বামপাশে চামড়া উঠে গেছে। লাশের পচন ধরায় যখমের চিহ্ন পরিলক্ষিত হয়নি। সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন সিদ্ধিরগঞ্জ থানা পুলিশের এসআই (নিরস্ত্র) কাজল চন্দ্র মজুমদার।