বিশেষ সম্পাদকীয় :
অন্তহীন ভাবনায় দেশের মানুষ। দু’ চোখে ধোঁয়াশা দেখছেন। দিন এনে দিন খায়, এমন শ্রমজীবী মানুষেরা দুশ্চিন্তায় নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন। আজ কোনমতে একবেলা আধাপেট খেয়েছেন তো আরেক বেলার চিন্তায় দিশেহারা কর্মহীন সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে দেশব্যাপি। আশাব্যাঞ্জক হচ্ছে- অসহায় মানুষের সাহায্যার্থে সরকারসহ দেশের বিত্তবানরা এগিয়ে এসেছেন।
বিশ্ব অর্থনীতির সাথে বাংলাদেশের অর্থনীতিও ভেঙ্গে পড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। মহামারী করোনাভাইরাসের ধকল উন্নত দেশগুলো সামলে নিতে পারলেও বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশের জন্য কঠিন পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে। করোনাভাইরাস এখন আরো ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়েছে। এপ্রিলের প্রথমদিকে আক্রান্ত এবং মৃত্যুর সংখ্যা কম থাকলে দ্বিতীয় সপ্তাহের শুরুতে বেড়েছে আক্রান্তের সংখ্যা এবং মৃত্যুর হার।
সরকার প্রধান শেখ হাসিনা শুরু থেকেই দেশের মানুষকে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা এবং হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার জন্য কঠোরভাবে পরামর্শ দিয়ে আসছিলেন। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীও মাঠে সাধারণ মানুষকে ঘরমুখো করতে অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন। কিন্তু শ্রমজীবী মানুষদের কোনভাবে ঘরবন্দি করে রাখা যাচ্ছে না।
রোগাক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর চেয়েও না খেয়ে মরার বেশি দুশ্চিন্তা খেটে খাওয়া মানুষদের মধ্যে। তাদের মধ্যে এমন আশঙ্কা কাজ করছে ত্রাণসামগ্রী দিয়ে কতদিন চলা যাবে বা যারা ত্রাণসামগ্রী দিচ্ছেন তারা কতদিন পর্যন্ত ত্রাণসামগ্রী বিতরণ অব্যাহত রাখবেন।
মঙ্গলবার সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করোনাভাইরাস মহামারী কেটে যাওয়ার পর বিশ্বব্যাপি খাদ্য সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এসময় তিনি দেশে খাদ্য উৎপাদনে কৃষকদের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তিনি বলেন, প্রত্যেকটি বাড়ির আঙ্গিনা যেন খালি না থাকে। প্রত্যেকে যেন অন্তত নিজের পরিবারের জন্য হলেও শাক-সবজি উৎপাদনে মনোযোগী হন।
এছাড়াও সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে প্রায় ৭৩ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। ব্যবসায়ীরা এবং সুশীল সমাজের লোকজন প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্যোগ সময়োপযোগী বলে সাধুবাদ জানিয়েছেন।
আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশ করোনাভাইরাসের কারণে দীর্ঘ সময় অচল হয়ে থাকার যে অর্থনৈতিক মন্দাভাব দেখা দেবে, এটাই স্বাভাবিক। তবুও বেঁচে থাকার জন্য সরকারি ছুটি এবং ঘরবন্দি হয়ে থাকার বিকল্প নেই। কারণ, করোনা পরিস্থিতি ব্যাপকহারে সংক্রমিত হলে আমাদের দেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যেতে পারে। এতে দেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অর্থনীতির চাকা সুদূর প্রসারী বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাই, সাহসিকতার সহিত এই মহাদূর্যোগ মোকাবেলা করতে হবে।
এগিয়ে আসতে হবে সরকারের পাশাপাশি সমাজের প্রত্যেকটি ধর্ণাঢ্য ও বিত্তশালী শ্রেণির মানুষজনকে। আপনারা দেখেছেন, এদেশে একশ্রেণির মানুষের কাছে টাকা রাখার জায়গা নেই। অন্যদিকে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটায় এসমাজেরই বিশাল একটি শ্রেণিগোষ্ঠি। যারা আজকে খেয়েছো তো পরদিনের খাবারের চিন্তায় ঘুম হারাম। কীভাবে স্ত্রী-সন্তান, মা-বাবা নিয়ে দু’বেলা খেয়ে পরে দিন কাটবে এই চিন্তায় তাদের ঘুম আসেনা। এমন বাংলাদেশ কিন্তু বঙ্গবন্ধু দেখতে চাননি। তিনি চেয়েছেন, দেশের প্রত্যেকটি মানুষ পেট পুরিয়ে খাবে, পরিধানের বস্ত্র পাবে, শিক্ষা-চিকিৎসা পাবে, সবাই হেসে খেলে জীবন কাটাবে।
করোনাভাইরাসের মত এই মহামারীর সময়ে কেউ না খেয়ে মারা যাক এমন প্রত্যাশা আমরা করতে পারিনা। একদিকে আমাদের এই দূর্যোগ কাটিয়ে ওঠতে হবে, অন্যদিকে একজন মানুষও যেন অভূক্ত হয়ে মারা না যায়। আমাদের সমাজের বিত্তশালী প্রত্যেকটি মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে।
মো. আলী হোসেন, সাংবাদিক ও লেখক
ahossain640@gmail.com