মূল অনুষ্ঠান নওগাঁর পতিসরে :
জাতীয়পর্যায়ে কবিগুরুর জন্মবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে সরকার। এ বছর জন্মবার্ষিকীর মূল অনুষ্ঠান হবে রবীন্দ্র স্মৃতিবিজড়িত নওগাঁর পতিসরে। আজ সোমবার দুপুর আড়াইটায় নওগাঁর পতিসরে রবীন্দ্র কাচারি বাড়ির দেবেন্দ্র মঞ্চে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন, রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। এবার বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫৬তম জন্মবার্ষিকী উদযাপনের প্রতিপাদ্য ‘মানুষের ধর্ম : রবীন্দ্রনাথ ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা’। আজ কবিগুরুর স্মৃতিবিজড়িত কুষ্টিয়ার শিলাইদহ, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর এবং খুলনার দক্ষিণডিহি ও পিঠাভোগসহ ঢাকায় যথাযোগ্য মর্যাদায় তাঁর জন্মবার্ষিকী উদযাপন করা হচ্ছে। এ উপলক্ষে রবীন্দ্রমেলা, রবীন্দ্রবিষয়ক আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে তিন দিনব্যাপী কবির চিত্রশিল্প প্রদর্শনী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বাংলা একাডেমি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সহযোগিতায় পতিসরের আলোকে কবিগুরুর জন্মবার্ষিকীর স্মরণিকা ও পোস্টার মুদ্রণ করবে। এছাড়াও দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কবিগুরুর জন্মবার্ষিকী উদযাপন করা হবে। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসসমূহ এ উপলক্ষে নানান কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। রবিঠাকুর ১২৬৮ বঙ্গাব্দের (ইংরেজি ১৮৬১) ২৫ শে বৈশাখ কলকাতার বিখ্যাত জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং মাতা সারদাসুন্দরী দেবী। তিনি ছিলেন পিতামাতার চতুর্দশ সন্তান। ইংরেজি ১৮৭৫ সালে মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মাতৃবিয়োগ ঘটে। পিতা দেবেন্দ্রনাথ দেশ ভ্রমণের নেশায় এবং জমিদারি দেখাশোনার জন্য বছরের অধিকাংশ সময় কলকাতার বাইরে থাকতেন। তাই ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান হয়েও রবীন্দ্রনাথের ছেলেবেলা কেটেছিল ভৃত্য ও গৃহশিক্ষকের অনুশাসনে। শৈশবে তিনি কলকাতার ওরিয়েন্টাল সেমিনারি, নর্মাল স্কুল, বেঙ্গল একাডেমি এবং সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজিয়েট স্কুলে পড়াশোনা করেন। কিন্তু বিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় অনাগ্রহী হওয়ায় বাড়িতেই গৃহশিক্ষক রেখে তাঁর শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। ছেলেবেলায় জোড়াসাঁকোর বাড়িতে অথবা বোলপুর ও পানিহাটির বাগানবাড়িতে প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে ঘুরে বেড়াতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন ছোট রবিঠাকুর। পড়ালেখার ফাঁকে ফাঁকে মাত্র আট বছর বয়সে তিনি কবিতা লেখা শুরু করেন। ১৮৭৮ সালে ব্যারিস্টারি পড়ার উদ্দেশ্যে তিনি ইংল্যান্ড যান। সেখানে তিনি ব্রাইটনের একটি পাবলিক স্কুলে ভর্তি হন। ১৮৭৯ সালে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনে আইনবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। প্রায় দেড় বছর ইংল্যান্ডে কাটিয়ে ১৮৮০ সালে কোনো ডিগ্রি না নিয়ে তিনি দেশে ফিরে আসেন। ১৮৮৩ সালের ভবতারিণী নামে এক কিশোরীর সঙ্গে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বিবাহিত জীবনে স্ত্রীর নাম পাল্টিয়ে তিনি রেখেছিলেন মৃণালিনী দেবী। ১৮৯১ সাল থেকে পিতার আদেশে নদিয়া, পাবনা, রাজশাহী জেলা ও উড়িষ্যার জমিদারি তদারকি করতে হয় রবীন্দ্রনাথকে। কুষ্টিয়ার শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে তিনি দীর্ঘসময় অতিবাহিত করেন। এ সময় তিনি প্রকৃতির প্রেমে মুগ্ধ হয়ে সাহিত্য কর্মে আত্মনিয়োগ করেন। প্রকৃতি ও বাস্তবজীবনের শিক্ষা থেকেই তাঁর মধ্যে ভাবগভীরতার উন্মেষ ঘটে। তিনি আধ্যাত্মচেতনা, ঐতিহ্যপ্রীতি, প্রকৃতিপ্রেম, মানবপ্রেম, স্বদেশপ্রেম, বিশ্বপ্রেম, রোমান্টিক সৌন্দর্যচেতনা, ভাব, গীতিধর্মিতা, চিত্ররূপ ময়তা, ভাষা, ছন্দ ও আঙ্গিকের বৈচিত্র্য, বাস্তবচেতনা ও প্রগতিচেতনাকে তাঁর সাহিত্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসাবে তুলে আনেন। ১৯০১ সালে রবীন্দ্রনাথ সপরিবারে শিলাইদহ ছেড়ে চলে আসেন বীরভূম জেলার বোলপুর শহরের উপকণ্ঠে শান্তি নিকেতনে। ১৯০২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর মাত্র ত্রিশ বছর বয়সে কবিপত্নী মৃণালিনী দেবী মারা যান। এরপর ১৯০৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর কন্যা রেণুকা, ১৯০৫ সালের ১৯ জানুয়ারি পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও ১৯০৭ সালের ২৩ নভেম্বর কনিষ্ঠ পুত্র শমীন্দ্রনাথ ঠাকুর মৃত্যুবরণ করেন। এই কঠিন মৃত্যুশোক, পিতার দেয়া দায়িত্ব ও প্রজাদের সুখ, দুঃখ, ভালোবাসা থেকে তিনি একের পর এক সৃষ্টি করেন অমরকীর্তি। বাংলা ভাষার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথকে গুরুদেব, কবিগুরু ও বিশ্বকবি অভিধায় ভূষিত করা হয়। রবীন্দ্রনাথের ৫২টি কাব্যগ্রন্থ, ৩৮টি নাটক, ১৩টি উপন্যাস ও ৩৬টি প্রবন্ধ ও অন্যান্য গদ্যসংকলন তাঁর জীবদ্দশায় বা মৃত্যুর পরে প্রকাশিত হয়। তাঁর সর্বমোট ৯৫টি ছোটগল্প ও ১৯১৫টি গান যথাক্রমে গল্পগুচ্ছ ও গীতবিতান সংকলনের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ১৯১০ সালে রচিত গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের জন্য ১৯১৩ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। বিশ্বকবি দীর্ঘদিন নানান রোগভোগের পর ইংরেজি ১৯৪১ সালে কলকাতার পৈতৃক বাসভবনে মৃত্যুবরণ করলেও বাংলা ভাষার প্রধানতম কবি হয়ে বাঙালির হৃদয়ে চির অমর আসন করে নিয়েছেন। উল্লেখ্য, পতিসরে ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিজস্ব জমিদারি এলাকা। পতিসরে রবীন্দ্রনাথ প্রথম আসেন ১৮৯১ সালে এবং শেষবারের মতো এসেছিলেন ১৯৩৭ সালে। তাই এ বছর কবির জন্মজয়ন্তীর মূল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে রবীন্দ্র স্মৃতিবিজড়িত নওগাঁ জেলার পতিসরে।