বিশেষ প্রতিবেদন :
১৯ জুলাই সবাইকে কাঁদিয়ে চলে যান সবার আত্মার-আত্মীয় প্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ। তিনি নেই, তবে তার কথা ঠিকই রয়ে গেছে। মানুষের সঙ্গে গাছের অনেক মিল আছে। সবচেয়ে বড় মিল হলো, গাছের মতো মানুষেরও শিকড় আছে। শিকড় উপড়ে ফেললে গাছের মৃত্যু হয়, মানুষেরও এক ধরনের মৃত্যু হয়। মানুষের নিয়তি হচ্ছে তাকে অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মৃত্যুর ভেতর দিয়ে অগ্রসর হতে হয় চূড়ান্ত মৃত্যুর দিকে
নিশ্চয়ই লাখো ভক্ত কবির সেই প্রিয় গানেই তাকে স্মরণ করবে।
যদি মন কাঁদে তুমি চলে এসো চলে এসো এক বর্ষায়
ঝরঝর বৃষ্টিতে জলভরা দৃষ্টিতে
এসো কোমল শ্যামলও ছায়ায়
চলে এসো তুমি চলে এসো এক বরষায়
হুমায়ূন আহমেদ সাহিত্যের খ্যাতিমান কথাশিল্পী, চলচ্চিত্র ও নাটক নির্মাতাদের প্রথম সারির লেখক। আগামীকাল বুধবার তার পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১২ সালের এইদিনে জনপ্রিয় এই লেখক যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ইন্তেকাল করেন।
দিবসটি উপলক্ষে কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদের পরিবারের পক্ষ থেকে নুহাশ পল্লীতে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। প্রকাশকরা নুহাশ পল্লীতে কথাশিল্পীকে শ্রদ্ধা জানাবেন এবং হুমায়ূন আহমেদ প্রতিষ্ঠিত ‘শহীদ স্মৃতি বিদ্যালয়ে’ দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে।
এ ছাড়াও প্রতি বছরের মতো এবারও চ্যানেল আই কিংবদন্তি এই শিল্পীকে নিবেদন করে বিশেষ আয়োজন রেখেছে। ১৯ জুলাই সকাল সাড়ে ৭টায় থাকছে সংগীতানুষ্ঠান ‘গানে গানে সকাল শুরু’। বিশেষ এই পর্বে পরিবেশন করা হবে হুমায়ূনের লেখা জনপ্রিয় কিছু গান। দুপুর ১২টায় প্রচার হবে ‘তারকা কথন’। অনুষ্ঠানে হুমায়ূনকে নিয়ে কথা বলবেন তারই কাছের মানুষেরা।
একইদিন দুপুর ২টার সংবাদের পর দর্শক দেখবেন হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস অবলম্বনে মেহের আফরোজ শাওন পরিচালিত ছবি ‘কৃষ্ণপক্ষ’। অভিনয় করেছেন রিয়াজ, মাহি, তানিয়া আহমেদ, আজাদ আবুল কালাম প্রমুখ। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় প্রচার হবে হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্ট ৫টি আলোচিত চরিত্র নিয়ে বিতর্ক অনুষ্ঠান ‘আমার মাধ্যমেই বেঁচে থাকবেন হুমায়ূন আহমেদ’।
রাত ৭টা ৫০ মিনিটে প্রচার হবে হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসের ছায়া অবলম্বনে রাজু আলীমের পরিচালনায় নির্মিত টেলিছবি ‘রূপার জন্য ভালোবাসা’।
এ তো গেলো ১৯ জুলাইয়ের আয়োজন। এর বাইরেও দেখা যাবে হুমায়ূন আহমেদ পরিচালিত তিনটি ছবি। এগুলো হলো— ‘আমার আছে জল’, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ ও ‘চন্দ্রকথা’। চ্যানেল আইয়ের পর্দায় এগুলো প্রচার হবে যথাক্রমে ২০, ২২ ও ২৯ জুলাই।
হুমায়ূন আহমেদ ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকেনা জেলার মোহনগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম ফয়েজুর রহমান। একাত্তরে পাকবাহিনী তাকে হত্যা করে। মা আয়েশা ফয়েজ। স্কুল জীবনে হুমায়ূন আহমেদকে পিতার চাকুরিস্থল কুমিল্লা, সিলেট, বগুড়া ও পঞ্চগড়সহ বিভিন্ন জেলায় বসবাস করতে হয়। ১৯৬৭ সালে বগুড়া জিলা স্কুল থেকে প্রবেশিকা (রাজশাহী বিভাগে মেধাতালিকায় দ্বিতীয়), ১৯৬৯ সালে ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবনেই তার লেখালেখি শুরু। ১৯৭২ সালে তার প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’ প্রকাশ পায়। তখন তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত হয় দ্বিতীয় উপন্যাস ‘শংখনীল কারাগার’। এই দুটি বই প্রকাশের পর হুমায়ূন আহমেদ একজন শক্তিশালী কথাশিল্পী হিসেবে পাঠকমহলে সমাদৃত হন। সেই থেকে জীবনকালে তার দুই শতাধিক বই প্রকাশিত হয়।
হুমায়ূন আহমেদ গল্প বলায় ভাষার ব্যবহারে নিজস্ব একটা কৌশল এবং বর্ণনায় লোকজধারাকে প্রাধান্য দেন। বাস্তবতা থেকেই উঠে এসেছে তার প্রতিটি সৃষ্টিকর্ম। মানুষের মানচিত্রও উঠে এসেছে। বাংলা সাহিত্যের কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যে তাকে পথিকৃৎ বলেছেন সমোলোচরা। তিনি উপন্যাস, গল্প, জীবনী, নাটক ও চলচ্চিত্রও করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তার লেখা বেশ কয়েকটি উপন্যাস, কয়েকটি নাটক, কয়েকটি চলচ্চিত্র কালজয়ী কর্ম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দীর্ঘদিন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন এবং লেখালেখিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করে শিক্ষকতা থেকে তিনি অবসর নেন। শিল্প-সংস্কৃতির প্রসারে হুমায়ূন আহমেদ গাজীপুরে প্রতিষ্ঠা করেন ‘নুহাশ পল্লী’। এই প্রতিষ্ঠানই ছিল তার সকল কাজের আঙ্গিনা। ২০১০ সালে সরকার হুমায়ূন আহমেদকে জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগ করে।
হুমায়ূন আহমেদের ১১৮টি গ্রন্থ প্রকাশ করেছে অন্য প্রকাশ। এই সংস্থার স্বত্তাধিকারী মাজহারুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, হুমায়ূন আহমেদ গত শতকের অন্যমত জনপ্রিয় লেখক। তার সৃষ্টিশীলতার জন্যই তিনি এই জনপ্রিয়তা পান। মৃত্যুর পরও পাঠকরা তার বই ক্রয় করছেন। তরুণ সমাজ ও নতুন পাঠকরা এখনও তার বইগুলা কিনছেন। তার বই বিক্রি খুব বেশি কমেনি। পুরনো বইগুলো এখন বিভিন্ন বয়সের পাঠক সংগ্রহ করছেন। বাংলাসাহিত্যে এই লেখকের সৃষ্টি অনাদিকাল ধরে অক্ষয় থাকবে।
তার প্রকাশিত অন্যান্য উল্লেখযোগ্য বই হচ্ছে, জ্যোৎস্না ও জননীর গল্প, মধ্যাহ্ন, হিমুর আছে জল, লীলাবতী, হরতন ইস্কাপন, হিমুর বাবার কথামালা, আমিও মিছির আলী, হিমু রিমান্ডে, মিছির আলীর চশমা, দিঘির জলে কার ছায়া গো, আজ হিমুর বিয়ে, লিলুয়া বাতাস, কিছু শৈশব, হুমায়ুন আহমেদের ভৌতিক অমনানিবাস, আগুনের পরশমনি, পাপ ৭১, শ্রাবন মেঘের দিন। তার নির্মিত চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে শংখনীল কারাগার, শ্রাবণ মেঘের দিন, দুই দুয়ারী, চন্দ্রকথা, শ্যামল ছায়া প্রভৃতি।
সাহিত্যে অবদানের জন্য হুমায়ূন আহমেদ একুশে পদক, বাংলা একাডেমী পুরস্কার, লেখক শিবির পুরস্কার, মাইকেল মধুসূদন পদকসহ অসংখ্য পুরস্কার লাভ করেন।