স্বাস্থ্য ডেস্ক :
দেশজুড়ে ডেঙ্গুর ভয়াল থাবায় প্রতিদিনই ঝরছে প্রাণ। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন আরও ১০ জন, নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ১,০৬৯ জন। চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে প্রাণ গেছে ৩০২ জনের। আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৪ হাজার ৯৯২ জনে। এই সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয়, বরং প্রতিদিন হাসপাতালের বেডে কাতরানো অগণিত রোগীর আর্তনাদ-যা এখন এক ভয়ংকর বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।
চিকিৎসা ব্যবস্থা চাপে, বেড ফুরিয়ে যাচ্ছে: রাজধানীর মুগদা, স্যার সলিমুল্লাহ (মিটফোর্ড), ঢাকা মেডিকেল, এবং শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতাল-সব জায়গাতেই একই চিত্র: রোগীর ঢল। অনেক রোগীকে মেঝেতে, এমনকি করিডরে শুয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
মুগদা মেডিকেলের ইনফেকশন ওয়ার্ডের এক চিকিৎসক জানালেন, রোগীর চাপ এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। অনেক সময় ওষুধ ও স্যালাইন দিয়েও পর্যাপ্ত নজরদারি সম্ভব হয় না, কারণ ডাক্তার ও নার্সদের অনুপাত রোগীর তুলনায় অনেক কম।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র বলছে, দেশের জেলা ও উপজেলা হাসপাতালগুলোতেও একই অবস্থা। চিকিৎসক সংকট, পর্যাপ্ত কিট ও পরীক্ষার সুবিধার অভাবের কারণে অনেক রোগীকে শহরমুখী হতে হচ্ছে। এতে রাজধানীর হাসপাতালগুলো আরও চাপে পড়ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রতিরোধ, কিন্তু সেটাই সবচেয়ে অবহেলিত। নগরবাসীর অনেকেই এখনো নিজেদের বাড়ি, ছাদ বা উঠানের ফুলের টবে জমে থাকা পানির দিকে নজর দেন না।
রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা রুবিনা সুলতানা বললেন, আমাদের এলাকায় মশার উপদ্রব আগের চেয়ে বেড়ে গেছে। সিটি করপোরেশনের লোক আসে না নিয়মিত। তবে অনেক বাসিন্দাও সচেতন না-ঘরের কোণে পানি জমে থাকে, ছাদে বালতি রাখা থাকে।
অন্যদিকে, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, নিয়মিত ফগিং ও সোর্স ধ্বংস অভিযান চালানো হচ্ছে, কিন্তু এত বিপুল এলাকা কাভার করা এখন প্রায় অসম্ভব। নাগরিক সহযোগিতা ছাড়া এ লড়াই জেতা সম্ভব নয়।
চিকিৎসকদের অমনোযোগও প্রশ্নের মুখে : অনেক রোগীর স্বজন অভিযোগ তুলেছেন হাসপাতালে রোগী ভর্তি করলেও প্রাথমিক চিকিৎসা বিলম্বিত হয়, পরীক্ষার রিপোর্ট পেতে সময় লাগে, এবং জটিল অবস্থায় প্রয়োজনীয় মনোযোগ পাওয়া যায় না।
মিটফোর্ড হাসপাতালের এক রোগীর ভাই বলেন, রোগী জ্বর নিয়ে ভর্তি, কিন্তু ডাক্তার দেখতে আসতে তিন ঘণ্টা লেগে গেল। পরে রক্তচাপ পড়ে গেলে তখনই দৌড়ঝাঁপ।
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) এক প্রতিনিধি অবশ্য দাবি করেছেন, ডাক্তাররা দিনরাত কাজ করছেন। কিন্তু রোগীর সংখ্যা এত বেশি যে, প্রতিটি রোগীকে একই মাত্রায় সময় দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, এবারের ডেঙ্গুর ধরন আগের চেয়ে অনেক বেশি জটিল। ডেঙ্গু ভাইরাসের নতুন সেরোটাইপে আক্রান্ত হলে শরীরে শ্বেত রক্তকণিকা ও প্লেটলেট দ্রুত কমে যায়, ফলে রোগীর অবস্থার অবনতি হঠাৎ ঘটে।
আইইডিসিআর (Institute of Epidemiology, Disease Control and Research) বলছে, এই বছর ডেঙ্গুর ভাইরাসের মধ্যে DEN-2 ও DEN-3 টাইপ বেশি সক্রিয়, যা রক্তক্ষরণ ও অঙ্গ বিকলতার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, পাঁচ বছরের নিচে শিশু এবং ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে বয়স্করা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন। তাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম হওয়ায় ডেঙ্গু দ্রুত জটিল আকার নেয়।
ঢাকা শিশু হাসপাতালের একজন চিকিৎসক বলেন, অনেক শিশু হাসপাতালে আসছে দেরিতে। অভিভাবকরা ভাবেন সাধারণ জ্বর, কিন্তু রক্ত পরীক্ষা করাতে দেরি করেন। তখন রোগীর অবস্থা জটিল হয়ে যায়।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, শুধুমাত্র চিকিৎসা নয়-জনসচেতনতা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম একসঙ্গে জোরদার করতে হবে।
কী করা দরকার? :
স্বাস্থ্যবিদ ডা. লুৎফর রহমান বলেন, ডেঙ্গু এখন আর মৌসুমি সমস্যা নয়, এটি সারা বছরব্যাপী জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হচ্ছে। যদি সরকার, সিটি করপোরেশন ও জনগণ একসঙ্গে দায়িত্ব না নেয়, তবে আগামী বছর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
অন্যদিকে পরিবেশবিদরা বলছেন, নগরায়ণ ও অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে বড় বাধা। রাজধানীর অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা স্থায়ী রূপ নিয়েছে, যা এডিস মশার বংশবিস্তারের আদর্শ পরিবেশ তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, এটি এখন ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ। কিন্তু এই যুদ্ধে সরকার বা চিকিৎসক একা জয়ী হতে পারবে না। জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া বিজয় অসম্ভব। শুধু হাসপাতালের বেড বাড়িয়ে নয়, বরং প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব নিতে হবে নিজ নিজ বাসা ও কর্মস্থল পরিচ্ছন্ন রাখার।
কারণ, প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে শুধু ভাইরাস নয়-অবহেলা, দায়িত্বহীনতা ও দেরির মিশ্র চিত্র লুকিয়ে আছে। এই মৃত্যুর মিছিল থামাতে এখনই প্রয়োজন শক্ত পদক্ষেপ-যেখানে কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি, চিকিৎসা ব্যবস্থার দক্ষতা এবং নাগরিক সচেতনতা একসঙ্গে কাজ করবে।
ডেঙ্গু এখন শুধু একটি রোগ নয়-এটি একটি সতর্কবার্তা, যা আমাদের নাগরিক দায়িত্ববোধ, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও জনস্বাস্থ্য নীতির দুর্বলতাকে একসঙ্গে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে। যদি এখনই আমরা দায়িত্ব না নেই-নিজ নিজ আঙিনা, সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিসরে-তাহলে এই যুদ্ধের হার আরও ভয়াবহ হবে।
ডেঙ্গুর ভয়কে হারাতে হলে দরকার সচেতনতা, সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও সঠিক সময়ের সঠিক পদক্ষেপ-এটাই এখন সময়ের দাবি।