সোমবার ২রা মার্চ, ২০২৬ ইং ১৮ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ:
ভূমিকম্প মোকাবিলায় ঢাকায় ১ লাখ স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুতের নির্দেশ ইসরায়েলে ও যুক্তরাষ্ট্রে এমন হামলা হবে, যা তারা আগে কখনো দেখেনি লক্ষ্মীপুরে আগুনে পুড়ে ৯ দোকান ছাই, ৭৫ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি মানবিক ও নিরাপদ বাংলাদেশ গঠনে সবার সহযোগিতা চাই নবনির্বাচিত ২৯৭ সংসদ সদস্যের গেজেট প্রকাশ নির্বাচনে ভোটের বক্স নিয়ে যাবে নদীর দিকে, আশঙ্কা জেএসডি নেতার ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির মহিমান্বিত রজনী-শবে বরাত জামায়াত ক্ষমতায় এলে দেশ পাকিস্তান হয়ে যাবে : ফজলুর রহমান লক্ষ্মীপুরে ৬ সিলসহ ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার : বিএনপি-জামায়াত প্রার্থীর পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন যাদের জন্য দেশে আসতে পেরেছেন, তারা জুলাইয়ের অবদান অস্বীকার করছেন : ডা. শফিকুর রহমান

ভাগ্যের চাকা ঘুরছে না ডাক বিভাগের

আকাশবার্তা ডেস্ক : 

ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত তদারকি না থাকা ও ডাক বিভাগের কর্মকর্তাদের উচ্চাভিলাষী ঘন ঘন বিদেশ ভ্রমণ, উদাসীনতা ও স্বেচ্ছাচারিতার কারণে বিভাগটি ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে। আর এর জন্য স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে। ফলে প্রধানমন্ত্রীর মহতী উদ্যোগ সফল হচ্ছে না বলে ডাক বিভাগের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানিয়েছেন।

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন ডাকঘরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চিঠি আর ডাকঘর এখন কালের অতল গহ্বরে হারিয়ে যেতে বসেছে। দুর্নীতি স্বেচ্ছাচারিতাসহ নানা কারণে মুখ থুবড়ে পড়া ডাক বিভাগকে গুনতে হচ্ছে লোকসানও। অবশ্য ডাক বিভাগের কিছুসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী লাভের মুখ দেখাতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে আসছেন বলেও পুরান কর্মচারীরা জানিয়েছেন।

জানা গেছে, গত ১/১১-এর সময়ের সরকার এই ডাক বিভাগকে বেসরকারি খাতে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তা না দিয়ে তিনি ডাক বিভাগ ঢেলে সাজানো এবং উন্নয়নের জন্য নানাবিধ উদ্যোগ গ্রহণ করেন। কিন্তু স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের চক্রান্তের কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমান সরকার এই বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ১১৮টি যানবাহন বা গাড়ি কেনা এবং ২০ তলাবিশিষ্ট ৮টি ভবন নির্মাণের প্রকল্প হাতে নিয়েছে। তার কাজ চলমান অবস্থায় রয়েছে। গত ১০ থেকে ১৫ বছর আগেও ডাক বিভাগ ছিল সাজানো-গোছানো ছিমছাম। তার সেই সোনালি জীবন এখন কেবলই অতীত বলে মনে করছেন অনেকেই। এক সময় ডাকঘরগুলোয় অনেককে ধরনা দিতে হতো। আর এ প্রতিষ্ঠানটি এখন প্রায় মৃত অবস্থায় রয়েছে। আগের মতো নেই এর জৌলুস। অথচ আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির দাপটের যুগেও পৃথিবীর বহু দেশে এখনো ডাকঘরনির্ভর যোগাযোগব্যবস্থাই প্রধান ভূমিকা পালন করছে।

শুধু তাই নয়, প্রতিবেশী দেশ ভারতের নাগরিকদের ডাকঘরকেন্দ্রিক যোগাযোগব্যবস্থাতেই অধিক আস্থা রয়েছে। আর বাংলাদেশে জনপ্রিয়তা হারানো ডাক বিভাগ এখন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। আধুনিকতার সঙ্গে তাল মেলাতে চেষ্টা চালাচ্ছে সরকারি প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু দুর্নীতি আর স্বেচ্ছাচারিতা, কাজে অবহেলা, উদাসীনতাসহ নানা বিধ কারণে প্রধানমন্ত্রীর সেই মহতী উদ্যোগ ভেস্তে যেতে বসেছে। ফলে মানবেতর জীবনযাপন করছেন ডাক বিভাগে কর্মরত অসংখ্য কর্মচারী। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মচারী জানান, দেশের প্রতিটি শাখা ডাকঘরে তিনজন করে কর্মচারী রয়েছেন। এদের মধ্যে একজন ইডিএ (এক্সট্রা ডিপার্টমেন্ট এজেন্ট), একজন ইডিএমসি (এক্সট্রা ডিপার্টমেন্ট মেইল ক্যারিয়ার) ও একজন ইডিডিএ (এক্সট্রা ডিপার্টমেন্ট ডেলিভারি এজেন্ট)। লোকজনের কাছে ইডিএরা পোস্টমাস্টার এবং ইডিএমসি ও ইডিডিএরা পিয়ন হিসেবেই বেশি পরিচিত।

এসব শাখার মধ্যে কোথাও আবার চৌকিদার-ঝাড়ুদারও কর্মরত। ঈদ বা পূজায় তাদের ভাগ্যে সরকারি অন্য কোনো সুযোগ-সুবিধা জোটে না। বছরের পর বছর ধরে বৈষম্যের শিকার হাজার হাজার কর্মচারী। অপর এক সূত্র জানায়, বাংলাদেশে ৯ হাজার ৮৮৬টি ডাকঘরের মধ্যে বিভাগীয় ডাকঘরের সংখ্যা ১৪২৬ এবং অবিভাগীয় ডাকঘরের সংখ্যা ৮৪৬০। আর ৩৯ হাজার ৯০৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। এর মধ্যে বিভাগীয় কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ১৬ হাজার ৮৮৬ এবং ভাতাপ্রাপ্ত বা অবিভাগীয় কর্মচারীর সংখ্যা ২৩ হাজার ২১ জন। অবিভাগীয় ডাক কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল, তাদের যেন একটি জাতীয় স্কেল দেওয়া হয়, কিন্তু তা করা হয়নি।

গত ২০০৮ সালে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আবার পর এক দফা ভাতা বাড়ানো হয়েছে অনেক কর্মচারীরা জানিয়েছেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার সময় সাড়ে ৭ কোটি মানুষের জন্য যে জনবল ছিল, এখন প্রায় ১৭ কোটি মানুষের জন্য সেই একই জনবল রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ৫ হাজার ৩০১ জন কর্মচারীকে স্থায়ী এবং আরো ৩ হাজার ৪৮৮ জনকে নিয়োগ দেয়ার অনুমোদন দিয়েছেন বলে জানা গেছে। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে দেশের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান প্রযুক্তির মাধ্যমে এগিয়ে গেলেও ডাক বিভাগ প্রযুক্তির ধারাক্রম অজপাড়াগাঁয়ে রয়েছে। এসএমএস, মেইল আর ফেসবুকে চ্যাটই প্রিয়জনের সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হিসেবে এখন ব্যবহৃত হচ্ছে। পরিবারের কেউ দেশের বাইরে কিংবা অন্য কোথাও অবস্থান করলে তা খোঁজ নেওয়া হতো চিঠির মাধ্যমে। তাকে বাড়ির ‘অবস্থা’ জানানোর একমাত্র মাধ্যম ছিল এই চিঠি। তখন মোবাইলের মতো দ্রুত যোগাযোগের মাধ্যম ছিল না। জনপ্রিয় ছিল চিঠি।

সূত্র জানায়, গত ২০০৪ সালেও দেশে ২৩ কোটি চিঠি লেনদেন হয়েছে। অথচ ২০১৩-১৪ অর্থবছরে সাধারণ চিঠি আদান-প্রদান হয়েছে মাত্র ৫ কোটি আর ২০১৪-১৫ সালে হয়েছে ৪ কোটি। এভাবেই প্রতিবছর ব্যক্তিগত চিঠির ব্যবহার দিন দিন কমছে। পুরনো দিনের চিঠি আজও প্রবীণ ও মধ্য বয়সীদের জীবন অধ্যায়ের পাতা। একটা সময় ডাক পিয়নেরও কদর ছিল যথেষ্ট। বিশেষ করে প্রেমের চিঠি বিলি করার নানা মজার ঘটনা এখনো অনেকের স্মৃতিতে অমলিন। ডাক বিভাগের নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মচারী নেতা জানান, স্বাধীনতাবিরোধী চক্র এখনও ডাক বিভাগে সক্রিয় রয়েছে। তাদের চক্রান্তের কারণেই এই বিভাগ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। বঙ্গবন্ধুর সরকারের সময় ৭৪ সালে একবার ডাক বিভাগে ধর্মঘট পালন করেছিল। সেই চক্রটি এখনও ঘাঁপটি মেরে রয়েছে। আর দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও ঘন ঘন কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণের কারণে এ বিভাগটি এগোতো পারছে না। ফলে প্রধানমন্ত্রীর মহতী উদ্যোগ ভেস্তে যেতে বসেছে। সরেজমিন খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, দেশের বেশিরভাগ ডাকঘরের অবস্থা করুণ। জনবলের অভাব, ভাঙা চেয়ার, টেবিল ও কাঠের বাক্স, আলমারি দিয়ে কোনোমতে চলছে কার্যক্রম। সরকারি আসবাবপত্রের বরাদ্দ হলেও তা উপজেলা ও শাখা পর্যায়ের ডাকঘরসমূহে পৌঁছে না। ফলে আসবাবপত্রের অভাব দীর্ঘদিন লেগে থাকে। আবার প্রয়োজনীয় আলমারি না থাকায় অফিসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র যেখানে-সেখানে অরক্ষিতভাবে ফেলে রাখায় তা বিনষ্ট হচ্ছে।

ডাক কর্মচারীরা জানান, দেশের বিপন্ন বেহালদশাগ্রস্ত ডাকঘরে ১১টি মূল সেবাসহ মোট দুই ডজনেরও বেশি সেবা চালু রয়েছে। এসব সেবার মধ্যে রয়েছেÑ ডাক বিভাগ দেশি-বিদেশি সাধারণ চিঠি, পোস্টকার্ড, রেজিস্ট্রি চিঠি, ডাকটিকিট বিক্রয়, পোস্টাল অর্ডার, মানি অর্ডার, পার্সেল, জিএমই (গ্রান্টেড মেইল এক্সপ্রেস), ইএমএস (এক্সপ্রেস মেইল সার্ভিস), ভিপিপি (ভ্যালু পেবল পার্সেল) ইস্যু ও বিলি, ভিপিএল (ভ্যালু পেবল লেটার), বিমা পার্সেল, স্মারক ডাকটিকিট বিক্রয়, মোবাইল মানি অর্ডার, ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংক, ডাক জীবনবীমা, সন্ধানী লাইফ ইন্স্যুরেন্স প্রিমিয়াম জমা, ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নে টাকা পাঠানো ও নন জুডিসিয়াল স্ট্যাম্প বিক্রি। এসবের মুষ্টিমেয় কয়েকটি সেবায় গত কয়েক মাস কিছুটা অগ্রগতি থাকলেও ডাক পরিবহনের সবকটি সেবায় গ্রাহক সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। গ্রাহকদের ডাক খোয়া যাওয়া, দেরিতে পাওয়া, পাওয়ার ক্ষেত্রে বিড়ম্বনা, অনিশ্চয়তার কারণেই গ্রাহক সংখ্যা দিন দিন কমছে। শুধু তাই নয়, অভ্যন্তরীণ মানি অর্ডারের প্রতিযোগিতায়ও টিকতে পারছে না ডাক বিভাগ। সেবার মান দুর্বল হওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক মানি অর্ডার নেমে এসেছে অর্ধেকে। আন্তর্জাতিক মানি অর্ডারের প্রয় ৮০ ভাগ নিয়ন্ত্রণ করছে বেসরকারি বিভিন্ন ব্যাংক। আর পার্সেল কমে গেছে আশঙ্কাজনকভাবে। স্ট্যাম্প বিক্রির অবস্থাও বেহাল। ইএমটিএস ও পোস্টাল কার্ড বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও নানা কারণে তা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রচার-প্রচারণার অভাবে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এ দুটি স্কিমে গ্রাহক বাড়ানো যাচ্ছে না। আর চালু হচ্ছে না নতুন সুবিধাও। পাসপোর্ট আবেদন চালু হলেও নানা কারণে বিভিন্ন সময় তা বন্ধ থাকছে। বিভিন্ন সঞ্চয়পত্রের স্কিমগুলো সফল হলেও ইদানীং সঞ্চয়ী হিসাব খুলে অর্থ জমা রাখায় গ্রাহকসংখ্যা কমছে। সুদ কম দেওয়ার কারণেই গ্রাহকসংখ্যা কমছে।

ডাকঘরের অন্যান্য সেবা কার্যক্রমের মধ্যে ই-ব্যাংকিং, জীবনবিমা, সাধারণ বিমাসহ সরকারি চিঠিপত্র, পার্সেল ইত্যাদি নানামুখী সুবিধা ও কার্যক্রম চালু রয়েছে। এসব কার্যক্রমের মধ্যে ই-ব্যাংকিং সেবা জনগণের মধ্যে সাড়া জাগালেও প্রাইভেট ই-ব্যাংকিং সুবিধার তুলনায় ডাকঘরে ই-ব্যাংকিং সেবা গ্রহণ করা অনেকটা ভোগান্তিমুক্ত বলে গ্রাহকরা জানিয়েছেন। এমনকি ইলেক্ট্রনিক মানি ট্রান্সফার সার্ভিস (ইএমটিএস), পোস্টাল ক্যাশ কার্ডসহ নতুন নতুন সেবা নিয়েও এগোতে পারছে না এই সংস্থা। আরেক সূত্র জানায়, ডাক বিভাগের প্রতি এখন তেমন আগ্রহ নেই এই প্রজন্মের আধুনিক মানুষের। যতটুকু আছে শুধুই দাপ্তরিক। রাজধানীতে কয়েকটি এলাকা ছাড়া অধিকাংশ জায়গায় গেলেই দেখা যায় চিঠি রাখার বাক্সের চারপাশে আগাছার রাজত্ব। চিঠির সংখ্যা কমার সঙ্গে সঙ্গে কমছে নগরীর রাস্তার ধারের পোস্টবক্সের সংখ্যা। নগরীর মোট ১৪০টি স্পটে পোস্টবক্স ছিল। সেসব স্পটের অনেক এলাকার ডাকবাক্স তুলে নেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে ডাক বিভাগের মহাপরিচালক সুশান্ত কুমার ম-লের সঙ্গে যোগাযোগ করলে গতকাল রোববার সকাল থেকে বারবার চেষ্টা করা হলেও দুপুর পর্যন্ত তাকে তার কার্যালয়ে পাওয়া যায়নি। পরে বিকালে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তার অফিস থেকে কম্পিউটার অপারেটর পরিচয়ে একজন বলেন, স্যার মিটিং-এ রয়েছেন, এখন স্যার কথা বলতে পারবেন না বলে জানান তিনি।

     এই বিভাগের আরও সংবাদ

আর্কাইভ

মার্চ ২০২৬
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
« ফেব্রুয়ারি    
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০৩১