শুক্রবার ২৭শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ইং ১৫ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ:
লক্ষ্মীপুরে আগুনে পুড়ে ৯ দোকান ছাই, ৭৫ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি মানবিক ও নিরাপদ বাংলাদেশ গঠনে সবার সহযোগিতা চাই নবনির্বাচিত ২৯৭ সংসদ সদস্যের গেজেট প্রকাশ নির্বাচনে ভোটের বক্স নিয়ে যাবে নদীর দিকে, আশঙ্কা জেএসডি নেতার ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির মহিমান্বিত রজনী-শবে বরাত জামায়াত ক্ষমতায় এলে দেশ পাকিস্তান হয়ে যাবে : ফজলুর রহমান লক্ষ্মীপুরে ৬ সিলসহ ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার : বিএনপি-জামায়াত প্রার্থীর পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন যাদের জন্য দেশে আসতে পেরেছেন, তারা জুলাইয়ের অবদান অস্বীকার করছেন : ডা. শফিকুর রহমান লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জে নিখোঁজের ৭দিন পর কলেজ ছাত্রের লাশ উদ্ধার লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জে যৌথবাহিনীর অভিযানে অস্ত্রসহ শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘চিতা’ গ্রেপ্তার

এরই নাম ‘ধানসিঁড়ি’

বিশেষ প্রতিবেদন :


“এর নাম ধানসিঁড়ি বুঝি?’ এ প্রশ্নের পর কবিতায় জীবনানন্দ দাশ যা লিখেছেন, তা থেকে বোঝা যায়, প্রশ্নটা মাছরাঙাদের। উত্তরে বলা হলো, মাছরাঙাদের বললাম;/ গভীর মেয়েটি এসে দিয়েছিল নাম।/ আজো আমি মেয়েটিকে খুঁজি;/ জলের অপার সিঁড়ি বেয়ে/ কোথায় যে চলে গেছে মেয়ে।”

প্রায় এক যুগ আগে প্রথমবারের মতো ধানসিঁড়ি তীরে দাঁড়িয়ে মনে এ প্রশ্ন জেগেছিলÑ “এর নাম ধানসিঁড়ি বুঝি?” বাংলাদেশের অন্যসব নদীর চেয়ে স্বতন্ত্র কিছু নয় ধানসিঁড়ি। অথচ জীবনানন্দ দাশের কবিতায় সবচেয়ে বেশি যে নদীটির নাম এসেছে, তা এই ধানসিঁড়ি। জন্মান্তরে কবি এ নদীতীরে ফিরে আসার আকাক্সক্ষাও ব্যক্ত করেছিলেনÑ “আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়ির তীরে এই বাংলায়/ হয়তো মানুষ নয়তোবা শঙ্খচিল শালিকের বেশে;/ হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে/ কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব এ কাঁঠালছায়ায়।”

ধারণা করা হয়, এ নদীর ধানসিঁড়ি নামটিও জীবনানন্দের দেওয়া। বরিশালের কবি হেনরি স্বপন বলেন, নদীটির আগেকার নাম ছিল ‘ধানসিদ্ধ’। এখনো বয়োবৃদ্ধরা নদীটি ধানসিদ্ধ নামেই জানেন। একদা এই নদীতীর ধান-চালের ব্যবসার জন্য বিখ্যাত ছিল। তখন এর উভয় তীরে চাল ব্যবসায়ীরা বড় বড় চুলা তৈরি করে দিন-রাত ধান সিদ্ধ করতেন এবং সে সময় কলকাতাসহ দূর-দূরান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা এসে এখান থেকে চাল সংগ্রহ করে নিয়ে যেতেন। নদীর দুই তীরে ধানসিদ্ধ হতো বলেই এই নদীর নাম হয়েছিল ধানসিদ্ধ। কবে, কখন যে, এর নাম বদলে ধানসিঁড়ি হয়েছে, সে তথ্য কারো জানা নেই। হেনরী স্বপনের ধারণাÑ নামটা নদ-নদী ও জনপদের নামকরণ ও নাম পরিবর্তনের স্বাভাবিক নিয়মে পরিবর্তিত হয়নি। কবি জীবনানন্দের কাব্য খ্যাতি এবং তার বহু কবিতায় এ নদীটিকে ধানসিঁড়ি হিসেবে উল্লেখ করায় নামটি কালে কালে বদলে গেছে। জীবনানন্দভক্তদের অনেকেই জানেন না, ধানসিঁড়ি নদীটির অবস্থান কোথায়?

কবি আলফ্রেড খোকন বলেন, বেশিরভাগ লোকজন মনে করেন, নদীটির অবস্থান বরিশালে। তিনি বরিশালের ছেলে হওয়ার কারণে বহুজন বহুবার তার কাছে ধানসিঁড়ির কথা জানতে চেয়েছেন। একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে কর্মরত এই কবি সর্বশেষ ২০১২ সালের শেষদিকে ধানসিঁড়ির তীরে গিয়েছিলেন বরিশাল নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের প্রয়োজনে। তিনি বলেন, প্রামাণ্যচিত্রে এটিই যে ধানসিঁড়ি নদী, এটা বোঝানোর মতো কোনো দৃশ্য পাচ্ছিলেন না। অবশেষে তিনি একটি জামে মসজিদ খুঁজে পেলেন, যেটিতে লেখা আছে ধানসিঁড়ি জামে মসজিদ। তার মতে, নদীতীরে কোথাও জীবনানন্দের কবিতা উদ্ধৃত করে একটি ফলক তৈরি করা যেত; করা যেত জীবনানন্দের একটি ভাস্কর্যও।

বরিশালের নাট্যদল শব্দাবলীর প্রধান এবং বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দ দুলাল বলেন, প্রধান সড়কে ধানসিঁড়ির দিকে যাওয়ার একটি নির্দেশনা ফলক এবং যেখানে ধানসিঁড়ি নদীর শুরু, সেখানটায় জীবনানন্দের একটি ভাস্কর্য তৈরি করার ব্যাপারে তারা উদ্যোগ নেবেন। ঝালকাঠি জেলা শহরের অদূরে গাবখান ব্রিজের পাশ থেকে নেমে কিছুদূর এগোলে চারটি নদীর মোহনা দেখা যায়; বিষখালী-সুগন্ধা-গাবখান ও ধানসিঁড়ি নদীর মোহনা এটি। এই মোহনার উত্তর-দক্ষিণে যে নদীটি বয়ে গেছে, সেটিই হলো কবি জীবনানন্দ দাশের ধানসিঁড়ি। সুগন্ধা হচ্ছে ঝালকাঠি জেলা শহরের নদী। উত্তর-দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত বিষখালী নদীটি দক্ষিণ-পশ্চিমে কাঁঠালিয়া, বরগুনার দিকে বয়ে গেছে। আবার উত্তর-পশ্চিম দিকে কাউখালী, পিরোজপুরের দিকে প্রবাহিত হচ্ছে গাবখান নদীটি। ফলে সুগন্ধা-বিষখালী-গাবখানের মুখোমুখি সংযোগস্থল থেকেই ধানসিঁড়ি নদীর শুরু। ঝালকাঠি জেলার গাবখান ইউনিয়নের বৈদারাপুর গ্রাম থেকে ধানসিঁড়ির যাত্রা শুরু। বৈদারাপুর থেকে ধানসিঁড়ি বয়ে গেছে ছত্রকান্দা গ্রাম হয়ে পিংড়ি, হাইলাকাঠি ও মঠবাড়ী এবং শুক্তাগড় ইউনিয়নের কোল ঘেঁষে রাজাপুর থানা সদর হয়ে জাঙ্গালিয়া নদীতে মিশেছে। ধানসিঁড়ি হচ্ছে ঝালকাঠি থেকে রাজাপুরের যোগসূত্রের প্রাণ ভোমরা। এককালে এই নদী দারুণ স্রোতস্বিনী ছিল। এখন নদীটির সেই স্রোত নেই, যৌবন নেই। কালের প্রবাহে এই নদী কেবল শীর্ণ হতে হতে মৃতপ্রায় আজ। শীতকালে পানি শুকিয়ে এমনই হয় যে, হেঁটে হেঁটে নদীটি যেন অবলীলায় পার হওয়া যায়। যদিও বর্ষা মৌসুমে কিছুটা স্রোত বয়ে চলে এবং দুকূল প্লাবিতও হয়।

সরেজমিন ধানসিঁড়ি তীরের রূপসি গ্রামে গিয়ে কথা হয় সেখানকার বাসিন্দা আফজাল হোসেনের সঙ্গে। ষাটোর্ধ্ব আফজাল আক্ষেপ করে বলেন, ‘নদীর মুহে (মুখে) চর পড়ছে। আগের মতো খারি (গভীরতা) নাই। হুনছি এই নদী দিয়া বড় স্টিমার চলতো। আমরাও দেকছি, ধানসিঁড়ি নদীতে অনেক তুফান অইতো। স্রোত আছিলো মেলা। এহোন তো মইরা গেছে।’ একই গ্রামের ৮০ বছর বয়সি কবির মুন্সি বলেন, এটা অনেক বড় নদী ছিল। বড় বড় জাহাজ চলতো এর বুকে। এখন ছোটো ট্রলারও চলতে পারে না। তিনি বলেন, সুগন্ধা, বিষখালী ও গাবখান নদের মোহনায় বিশাল চর জেগে ওঠায় এ নদীর মুখের দক্ষিণ পাশের চরকাঠি এলাকা ভরাট হয়ে যাওয়ায় নদীর মুখ ছোটো ও গভীরতা কমে যাওয়ার কারণে শেষ প্রান্তে গিয়ে নদীটি প্রায় মরে গেছে। আফজাল গোসেন ও কবির মুন্সি জানান, দেশ-বিদেশের বহু মানুষ আসেন এ নদী দেখতে। কিন্তু অনেকেই এসে হতাশ হন। কারণ, ধানসিঁড়ি এখন যৌবন হারিয়ে মরা খালে পরিণত হয়েছে। ধানসিঁড়ি তীরের বাসিন্দা হয়ে তারা গর্ববোধ করেন এবং এ নদীকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য নিয়মিত খননের দাবি জানান।

পানি উন্নয়ন বোর্ড ঝালকাঠি বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী সৈয়দ মহসিনুল ইসলাম বলেন, সর্বশেষ ২০১০-১১ অর্থবছরে প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে ধানসিঁড়ি নদীর উৎস মুখ থেকে সাড়ে সাত কিলোমিটার পশ্চিমে খননের একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। ওই সময় সাড়ে চার কিলোমিটার খনন করা হয়েছিল। নিয়মিত বরাদ্দ না দেওয়ায় পরের সাড়ে তিন কিলোমিটার আর খনন করা হয়নি। প্রায় আট কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে ধানসিঁড়ি নদীর রাজাপুর অংশের অবস্থা বড়ই করুণ বলে তিনি জানান। ধানসিঁড়ি নদীর রাজাপুর অংশে খননের অভাবে ও বাগড়িবাজার গরুর হাট এলাকায় দখল হওয়ার কারণে নদী এখন মরা খালে পরিণত হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে ৮৪ লাখ টাকা ব্যয়ে রাজাপুর অংশের পিংড়ি-বাগড়ি-বাঁশতলার মোহনা পর্যন্ত খনন করা হয়েছিল। কিন্তু উৎস মুখ ভরাট হওয়ায় নদীর ওই অংশ আবারও ভরাট হয়ে গেছে।

সর্বত্র কচুরিপানা আটকে আছে। নদী তীরের উপজেলার উত্তর-পূর্ব বাগড়ি গ্রামের বাসিন্দা ইদ্রিস হাওলাদার ও আউয়াল গাজী জানান, খননের সময় পানির চাপের মৌসুম ছিল। এ জন্য ঠিকাদার দুপাড়ের মাটি ছেঁটে নদীর মধ্যে ফেলেছে। এতে সঠিকভাবে গভীর না হওয়ায় এবং পুরো নদী না কাটায় খননকৃত অংশও দ্রুত ভরে গেছে। সংলগ্ন মঠবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামাল সিকদার বলেন, মঠবাড়ি ইউনিয়নের মধ্যে ধানসিঁড়ি নদীর প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকা রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে এ নদীর অবস্থা এতটাই করুণ যে, নৌকা চলাচলও করতে পারছে না। খননের সময় রাজাপুর অংশেরও অর্ধেক খননের কারণে খননকৃত অংশ দ্রুত ভরে গেছে। তাছাড়া যত্রতত্র মাছ ধরার ঝাউ দেওয়ার কারণেও বাঁশতলা মোহনার বিভিন্ন পয়েন্টে পলি জমে নাব্য হারিয়েছে ধানসিঁড়ি।

     এই বিভাগের আরও সংবাদ

আর্কাইভ

ফেব্রুয়ারি ২০২৬
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
« জানুয়ারি    
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮