বিশেষ প্রতিবেদন :
ধর্মকে ব্যবহার করে শিক্ষিত তরুণদের জঙ্গি কার্যক্রমে এমনভাবে ব্রেইনওয়াশ করা হয় সেখান থেকে আর সরে আসা সম্ভব হয় না। যে কারণে মেধাবী তরুণ উগ্র মতবাদে আকৃষ্ট হয়। আত্মঘাতীও হতে ভয় পায় না। ধর্মের লেবাসে দেশি কিংবা আন্তর্জাতিক কোনো দুষ্টচক্র এসব তরুণদের ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে বিপথগামী করছে। ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নামে কোমলমতি সন্তানকে নির্দেশ দেয় পিতাকেও হত্যা করার। তুলনামূলক ধনী পরিবারের উচ্চ শিক্ষিত তরুণরাই ভুল পথে পা বাড়াচ্ছে। ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, জঙ্গিচক্র বিভিন্ন ইউনিভার্সিটি, স্কুলের মেধাবী উচ্চবিত্তের ছেলেদের বিভিন্নভাবে প্রলুব্ধ করে। প্রথমে কিছুদিন ইসলাম আর আল্লাহর কথা বলে, কোরান হাদিসের কথা বলে নামাজে অভ্যস্ত করে। এরপর ধীরে ধীরে তারা মাত্রা এবং সুযোগ বুঝে এ ধরনের উগ্র প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। গত শনিবার রাজধানীর মিরপুর থেকে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের দুই সদস্য শাহাদাত হোসেন ওরফে সজীব ও ইশতিয়াকুর রহমান ওরফে রবিনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব।
জঙ্গি কার্যক্রমে আসা সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদে শাহাদাত র্যাবকে জানিয়েছেন, ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য তার বাবাকেই প্রথমে হত্যা করতে হবে বলে সংগঠনের নির্দেশ ছিল। এ নিয়ে শাহাদাত দোটানার মধ্যে ছিলেন। এ পরিস্থিতিতেই শাহাদাত র?্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হন। শাহাদাতের বাবা আমির হোসেন মিরপুরের নয় নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শাহাদাৎ একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ শেষ করে বাবার ব্যবসা দেখাশোনা করতো। এছাড়া তার সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া ইশতিয়াকুর রাহমানও অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর। এর একদিন পর গত রোববার রাজশাহীর তানোর উপজেলার বিলশহর এলাকায় অভিযান চালিয়ে জেএমবির তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করে র?্যাব-৫। এর আগে বিভিন্ন সময় জঙ্গি কার্যক্রমের অভিযোগে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে অনেকেই গ্রেপ্তার হয়েছেন। অনেক যুবক জঙ্গি তৎপরতা চালাতে গিয়ে নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে অধিকাংশই শিক্ষিত এবং ধনী পরিবারের সন্তান।
গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারি অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে ভয়াবহ জঙ্গিহামলায় অংশ নেয়া ৬ জঙ্গি ছিলো আধুনিক শিক্ষায় উচ্চশিক্ষিত। সমাজের বিত্তশালী পরিবারের সন্তান। ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল থেকে শুরু করে উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিÑ সবই ছিল তাদের। এরপর আলোচিত শোলাকিয়ার ঘটনা, পুরান ঢাকার হোসনি দালানের সামনে তাজিয়া মিছিলের ঘটনায় জড়িতরা সবাই শিক্ষিত। জঙ্গি সংশ্লিষ্টতায় গ্রেপ্তার হওয়া ফয়সাল বিন নাইম ওরফে দীপ, মাকসুদুল হাসান অনিক, রুম্মন, ইরাদ নাফিজ ইমতিয়াজ, সাদমান ইয়াসির মাহমুদ, শফিউর রহমান ফারাবী, আসিফ আদনান, মারজান থেকে শুরু করে সর্বশেষ গ্রেপ্তার হওয়া অনেকেই উচ্চ শিক্ষিত।
জঙ্গি সংগঠন নিয়ে কাজ করা গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, জঙ্গি সংগঠনগুলো সাধারণত ধর্ম নিয়ে যাদের দুর্বলতা বা কৌতূহল আছে শুধু সেসব শিক্ষিত তরুণকেই টার্গেট করে। এরপর তথ্যপ্রযুক্তিগত জ্ঞান ও এ ধরনের টেকনোলজির ব্যয় বহন করতে পারে এমন তরুণদের ব্রেইনওয়াশ করে প্রশিক্ষণ দেয়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই এসব ছেলেরা ভুল পথে পা বাড়ায়। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর মাসুদা এম রশীদ চৌধুরী বলেন, শিক্ষিত যুবকদের এভাবে উগ্র মতাবাদে জড়িয়ে পড়া খুবই উদ্বেগের বিষয়। তরুণদের মধ্যে কেউ কেউ অতি আবেগে, কেউ ধর্ম-রাজনীতি সম্পর্কে না বুঝে, আবার কেউ কেউ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে হতাশায় ভুল পথে পা বাড়ায়। অনেক ইংলিশ মিডিয়ামসহ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা দেশি সংস্কৃতি এবং দেশের মূল ধারার মানুষের সঙ্গেও মেশার সুযোগ পাচ্ছে না। তার মতে, পারিবারিক বন্ধন অটুট রাখা জরুরি। শিশু বয়সেই সন্তানকে সঠিক ধর্ম জ্ঞান দেয়া উচিত। বাবা-মাকে সন্তানদের পেছনে সময় দিতে হবে। ছোটোবেলা থেকেই পারিবারিকভাবে দেশের উন্নয়ন ও সেবামূলক শিক্ষা দিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সকল জায়গায় খেলাধুলাসহ বিনোদনেরও ব্যবস্থা, সামাজিক সংগঠনগুলোর সম্পৃক্ততা বৃদ্ধিসহ রাষ্ট্রকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
সূত্র : দৈনিক আমার সংবাদ।