আকাশবার্তা ডেস্ক :
‘হে অমর ২১ শে ফেব্রুয়ারি / হাজারো মা বোনের / ইজ্জ্বতের বিনিময়ে শহীদ দিবস আমি/ কি তোমায় ভুলিতে পারি।’ পাঠক একটু কি ভ্রু কুঁচকালেন লেখাটা পড়ে? বানান ভুল আছে! বাক্য গঠনও হয় নি! ঠিকই ধরেছেন। এটাই সত্য। শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের দারুণ নমুনা!আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে ভাষা শহীদদের স্মরণে নান্দনিক ওয়ার্ড হিসেবে পরিচিত জামালখান এলাকায় টাঙানো একটি ব্যানারের বক্তব্য এটি। সৌজন্যে ফিরোজ পাটোয়ারী ; নাম দেখে বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে না যে শ্রদ্ধা (!) প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে তিনি ব্যানারটি ছাপিয়েছেন গাঁটের পয়সা খরচ করে। ব্যানারে অবলিলায় ব্যবহার করা হয়েছে স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি। আছে তাঁর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর পুত্র ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার পেছনে অবদান রেখে চলা সজীব ওয়াজেদ জয়ের ছবি। অারো আছেন বন্দর নগরী চট্টগ্রামের নগরপিতা আ জ ম নাছির উদ্দীনের ছবি। কিন্তু ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা নাই এমন কেউ মহান ব্যক্তিদের ছবি অবলীলায় ব্যবহার করে এ কেমন শ্রদ্ধা প্রদর্শন করলেন! তিনি নিজেই অনুধাবন করতে পারেন নি, এই ব্যানারের মাধ্যমে তিনি কতোটা অসম্মান করলেন শহীদদের পাশাপাশি ব্যানারের চার কীর্তিমানকে।
মহান একুশে ফেব্রুয়ারি আজ। ১৯৫২ সালের আজকের এই দিনকেই বাংলার স্বাধীকার আদায়ের আন্দোলনের প্রথম কার্যকরী পদক্ষেপ বলে মনে করা হয়। যেদিন ভাষার জন্য প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন জব্বার, রফিক, সালামের মতো নাম না জানা আরো বীর যুবারা। কাল বিকেলে ওই ব্যানারের সামনে এ প্রতিবেদকের মতো স্তম্ভিত এক নারী ও তার স্কুল পড়ুয়া ছেলের দেখা মিললো। শোভন নামের সপ্তম শ্রেণীর সেই ছাত্রটি তার মায়ের কাছেই জানতে চাইলো হাজারো মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে আমরা শহীদ দিবস পেলাম কীভাবে? তবে কি কোন ছেলে সেদিন শহীদ হয় নি? অার আমরা প্রাণের বিনিময়ে বাংলা ভাষা পেয়েছি। শহীদ দিবসতো পাইনি। ছেলেটির মা এ প্রতিবেদকের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে চাইলেন। বললেন, কী বলি তাকে বলুনতো? আমি তাঁর অসহায়ত্ব বুঝতে পারছিলাম। কেননা আমি নিজেও উত্তর খুঁজে পাইনি, তার একের পর এক প্রশ্নের। ততক্ষণে সেখানে ছোট খাট জটলা হয়ে গেছে।
ফিরোজ পাটোয়ারী নামের ওই ব্যক্তির প্রতি দায় চাপিয়ে কী আর হবে? শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে হয় বিনম্রভাবে। কিন্তু ২১ নং জামালখান ওয়ার্ডের আওয়ামীলীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, শ্রমিকলীগ, স্বেচ্ছাসেবকলীগ ও মহিলালীগের নামে টাঙানো এ ব্যানারটির মাধ্যমে প্রতিটি সংগঠনের প্রত্যেক সদস্যের মাথা যে কিছুটা হলেও হেঁট হলো তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
রফিকুল ইসলাম নামের এক শিক্ষকতো বলেই বসলেন, শহীদের প্রতি এ কেমন শ্রদ্ধা জানানো! কোথায় আমাদের নম্রতা, যার মধ্য দিয়ে শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ ঘটবে। উত্তরটাও তিনি দিলেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের আচরণে জীবিত মানুষের প্রতিই শ্রদ্ধা নেই, আর শহীদ সালাম বরকতেরা কী করেছেন তা তাদের জানার দরকার কী? কলেজ ছাত্র নওশিন ও আশা হেঁটে আসছিলেন। আশা-ই বান্ধবীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। নওশিন একবার ব্যানারের দিকে তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নেয়। তার কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই আফসোস করে বলতে শোনা যায়, ‘সবই লোক দেখানো শ্রদ্ধা। নেতার চোখে পড়াটাই টার্গেট’।
একুশে ফেব্রুয়ারির এই দিনটিতে ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। কিন্তু এটি এখন প্রায়শই রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহৃত। লোক দেখানো আর নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য শহীদের বেদিতে ফুল অর্পণ করেন অনেকে। হৃদয়ের টানে কিংবা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে নয়। ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধা জানাতে হয় অন্তর থেকে সেখানে অন্য কোন বিষয়কে তুলে ধরা মানে নিজেদের অসহায়ত্বকে বরণ করা। কিছুদিন আগে ফেইসবুকে এমন এক হাস্যকর ব্যানারের ছবি শোভা পেয়েছিল। বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর শোক সভায় যোগ দিতে মিছিলটি এসেছিল। তাদের ব্যানারে বড় বড় হরফে লেখা “আজকের শোক সভায় যোগ দিন, সফল করুন’। মনে হচ্ছিল এ কোন রাজনৈতিক জনসভা। মিছিলকারীদের চোখে মুখে উল্লাসের ছাপ। শোকের রেশমাত্রও নেই সেখানে। ছাত্রলীগ, আওয়ামীলীগের অনেক নেতা কর্মী ক্ষোভ প্রকাশ করে ঐ ছবিটির নিচে স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন।
বাংলা ভাষার প্রতি দরদের নমুনা চলতে ফিরতে বহু দেখা যায়। ব্যানারে, পোস্টারে, পাঠ্য বইয়ে– সর্বত্রই তাচ্ছিল্য হরহামেশাই চোখে পড়ে। ভুল লিখতে গিয়ে ‘ভূল’ হওয়া নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। মূর্ধন্য আর দন্ত ন নিয়েতো জগাখিচুড়ি চলছেই। এক লাইনে শব্দ যদি থাকে বিশটা, তাতে বানানে ভুল থাকে দশটা। বাংলা লিখতে, পড়তে, বলতে সতর্ক থাকবে না, অথচ শ্রদ্ধা জ্ঞাপনে সবার আগে হাজিরা দেবে, এইতো ভাষা প্রেম! এমন দরদের কোন অর্থ নেই। আবেগ দিয়ে নয়, কথা দিয়ে নয়, আদিখ্যেতা দিয়েও নয়, ভাষা শহীদদের প্রতি সত্যিকার শ্রদ্ধা, সম্মান, ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হবে কাজের মাধ্যমে এবং দিবস কেন্দ্রিক নয় বরং বছরের প্রতিটি দিনে।
সূত্র : দৈনিক আজাদী