বিশেষ সম্পাদকীয়-
ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এবং সমাজের জন্য সবচেয়ে বড় মরণব্যাধি হচ্ছে মাদক বা মাদকাসক্ত। অবশেষে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে মাদকবিরোধী অভিযান শুরু করে র্যাব, পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। মাদকের বিরুদ্ধে যৌথ বাহিনীর অভিযান বা পৃথক অভিযান যাই হোক দেশের আপামর জনগণ তা সমর্থন করেছে।
প্রথম প্রথম বিএনপি মাদকবিরোধী অভিযানকে রাজনৈতিক রঙ দেওয়ার চেষ্টা করলেও মানুষ তা সমর্থন করেনি। এর কারণ হচ্ছে, ইয়াবা নামক মরণঘাতি নেশা যে পরিবারে আঁছড় দিয়েছে, সেই পরিবারে একেবারে পঁচন ধরেছে। শেষ করে দিয়েছে পুরো একটি পরিবারকে। তাই মাদক বিরোধী অভিযান ব্যাপক জনসমর্থন পায়।

ঠিক এমনি এক সময়ে টেকনাফ পৌরসভার ৩ বারের নির্বাচিত কাউন্সিলর ও উপজেলা যুবলীগের সভাপতি একরামুল হক মাদকবিরোধী অভিযানে নিহত হয়। অভিযানকালে কাউন্সিলর একরামের মেয়ের বার বার বাসা থেকে ফোন কল আসতে থাকে একরামের মোবাইলে এবং কোন এক সময় কথিত বন্দুকযুদ্ধের পুরো ঘটনা মোবাইলে অডিও রেকর্ড হয়ে যায়। ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া একরাম নিহতের ঘটনা এবং বাবা ও মেয়ের কথপোকথন শুনে কাঁদেনি এমন হৃদয়হীন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবেনা। আব্বু তুমি কান্না করতেছো যে, মেয়ের এমন আকুতিভরা কথা দেশের সব বাবাকে কাঁদিয়েছে। চোখের পানি কেউ সংবরণ করতে পারেনি। বাবার জন্য সন্তানের ভালোবাসা হয়তো এমনই হয়।
প্রত্যেক মহৎ কাজের ক্ষেত্রে কিছু অনিয়ম, অন্যায়, ভুল, সঠিক কর্ম পরিকল্পনার অভাব, যাচাই-বাছাই না করা, আর্থিক কেলেংকারী বা দুর্নীতির কারণে পুরো অভিযান প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। এরআগে সন্ত্রাস বিরোধী অভিযানে নারায়ণগঞ্জের ৭ খুন পুরো অভিযানকে কলঙ্কিত করেছে। অথচ দেশের মানুষ এমনটি হোক তা’ চায়নি।
মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন ঘোষণা দেন, তখন অত্যন্ত খুশি হয়েছি। কারণ আমি মাদককে খুব ঘৃণা করি। আমার দেখা, আমার মাধ্যমিক স্কুল জীবনের দু’একজন বন্ধুও ইয়াবাসহ মাদকের নেশায় ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। তারা এখন তাদের নিজেদের পরিবারের জন্য বোঝা হয়ে গেছে।

একরাম নিহত প্রসঙ্গে সার কথা হলো সত্যিই কী তিনি অপরাধী ছিলেন? স্থানীয় পৌরসভার একজন ওয়ার্ড কাউন্সিলর যদি সত্যি সত্যিই মাদক ব্যবসায়ী হয় তবুও আরো সময় নিয়ে যাচাই বাছাই করা প্রয়োজন ছিল। কারণ জীবন নেওয়া খুব সহজ, কিন্তু কারো জীবন একমাত্র আল্লাহপাক রাব্বুল আল আমিন ছাড়া আর কেউ দিতে পারবেন না। আরো অতি নগণ্য ব্যক্তি হলেও চূড়ান্ত শাস্তি দেওয়ার আগে ভালো করে জেনে নেওয়া অবশ্যই প্রয়োজন। যদিও বন্দুকযুদ্ধের নামে কাউকে হত্যা প্রচলিত আইন বা মানবাধিকারের চরম লঙ্গন। তবে এক ব্যক্তির জন্য যদি সমাজের হাজারো মানুষ স্বস্তি পায়, শান্তি পায় সেক্ষেত্রে কারো অনাকাঙ্খিত মৃত্যু হলে নিরবে সহ্য করতেই হয়। তাই বলে যাচাই বাছাই ছাড়া একজন জনপ্রতিনিধি বা যেকোনো মানুষ হত্যার শিকার হোক তা কারো কাম্য নয়।
মাদকবিরোধী অভিযান সময়ের প্রয়োজনেই কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন। কারণ তিনি এর ভয়াবহতা সম্পর্কে অবহিত। যেমনিভাবে তিনি জঙ্গি এবং সন্ত্রাস বিরোধী অভিযান চালিয়ে সফল হয়েছেন। জঙ্গি-সন্ত্রাসের চেয়েও মাদক আমাদের দেশের জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর বা মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইয়াবাসহ মাদকের থাবায় ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে আমাদের শিশু, ছাত্র, তরুণ ও যুবসমাজ। ঘরে ঘরে অশান্তির মূল কারণ এখন মাদক তথা ইয়াবা। প্রায় প্রত্যেক পরিবারে এর ছোঁয়া লেগেছে। মাদকাসক্ত ছেলের কাছে মা’ বাবা, ভাই, বোন বা নিজের স্ত্রী-সন্তান কেউ নিরাপদ নয়। নেশার যন্ত্রণা যখন বেড়ে যায়, তখন মাদকাসক্তরা আপন-পর কাউকে চিনেনা সবাইকে আঘাত করে।

একরামুল হকের বিষয়ে যাচাই বাছাই না করেই ঘটনার সমাপ্তি করা হলো, অথচ ইয়াবার মূলহোতা এমপি আব্দুর রহমান বদি অপরাধী না নিরাপরাধ সেটা যাচাই বাছাই করার জন্য সময়ক্ষেপন করে তাকে বিদেশে নিরাপদে চলে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হলো কার স্বার্থে। সংসদ সদস্য হলেই কী তাদের ৭ খুন মাপ? নাকী আওয়ামীলীগ তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য বদির মত লোক ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি তো তা মনে করিনা। কারণ শেখ হাসিনা আবার ক্ষমতায় যাবেন কী যাবেন না সেটা তিনিই ভালো করে জানেন। এখানে আব্দুর রহমান বদি কোনো ফ্যাক্টর নয়। তাহলে কার স্বার্থে শত অভিযোগের পরও বদি ছাড় পাবে?
তবে হত্যাকান্ডের মাধ্যমে বা ক্রসফায়ার আর বন্দুকযুদ্ধ যে নামেই বলুন, এর মাধ্যমে মাদক নির্মূলের স্থায়ী সমাধান হবেনা। প্রয়োজন যথোপযুক্ত আইন। জামিন অযোগ্য ধারাসহ মৃত্যুদন্ডের বিধান রেখে মাদকবিরোধী আইন প্রণয়ন করতে হবে। ওই আইনে বিচার শেষ করায় সময়ও বেঁধে দেওয়া থাকতে হবে এবং সময় দিতে হবে সর্বোচ্চ ৬ মাস থেকে ১ বছর। তাহলে একদিকে মাদক আইনে কেউ গ্রেপ্তার হলেও জামিনে বেরিয়ে আসতে পারবেনা, অপরদিকে ১ বছরের মধ্যে বিচার শেষ হলে বিনা বিচারে কেউ দীর্ঘ বছর জেলও খাটতে হবেনা। নির্দোষ প্রমাণ হলে খালাস পাবেন আর দোষী প্রমাণিত হলে কারাগারেই থাকবেন। এতে আইন বর্হিভূত হত্যা বন্ধ হবে এবং দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে।
পরিশেষে বলব, মাদকবিরোধী অভিযান যদি লাইনচ্যুত হয়ে যায় তাহলে তাকে লাইনে টেনে তুলতে হবে। নইলে অপরাধীরা পার পেয়ে যাবে, আর নিরাপরাধীরা ঘটনার শিকার হবে। সঠিক পথে এগিয়ে যাক মাদকবিরোধী অভিযান সে প্রত্যাশা রইল।
লেখক : মো. আলী হোসেন, সম্পাদক-আকাশবার্তাবিডি ডটকম।