গণমাধ্যম নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে এমনটাই প্রত্যাশা করেন পাঠক সমাজ। কারণ আমাদের দেশে নিরপেক্ষ কথাটি যেন সবার মনে স্থান করে নিয়েছে। নিরপেক্ষ শব্দটি বাংলাদেশের সবার কাছে অতি পরিচিত। মানুষের ধারণা নিরপেক্ষ মানে ভালো। কথা হচ্ছে, নিরপেক্ষ বলতে আসলে পাঠক সমাজ কী মনে করেন? নিরপেক্ষ মানেই ভালো এমন ধারণা কোথায় থেকে উদ্ভব হলো?
মুক্তিযুদ্ধের আগে পরে আমাদের দেশে বহু সংবাদ মাধ্যম প্রকাশিত হয়ে আসছে। মুক্তিযুদ্ধের আগে পত্রিকা বা টেলিভিশন এবং বেতার সংখ্যা কয়টি ছিল? রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন, বেতার ছাড়া পত্রিকা ছিল ইত্তেফাক, দৈনিক আজাদিসহ ৫/৬টির মত। তবে তখনকার সময় বিবিসি, ভয়েজ অব আমেরিকা বা কলকাতার আকাশবাণী সংবাদ বেশি শুনত পূর্ব বাংলার মানুষ। কারণ পত্রিকা তখনো পাঠকদের অতটা হাতের নাগালে ছিলনা।
ভাষা আন্দোলন বা মুক্তিযুদ্ধের সময় পূর্ব বাংলার সংবাদ মাধ্যমগুলো পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠির পক্ষ ত্যাগ করে অবস্থান নিয়েছিল পূর্ব বাংলার জনগণের ন্যায্যা দাবির পক্ষে। যার কারণে ওই সময় এসব পত্রিকা বা সংবাদ মাধ্যম পাঠকদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়। গণমাধ্যম নিরপেক্ষতা বজায় রাখবে বলতে যেটি বোঝানো হয়েছে, তা হচ্ছে গণমাধ্যম সবার কথা বলবে। সবাই বলতে কেউ আর বাদ থাকবেনা। তাহলে কী গণমাধ্যম অন্যায়কারীর পক্ষেও বলবে? সমাজ বা রাষ্ট্রে দুটি দিক রয়েছে। একটি অন্যায় অপরটি ন্যায়। ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য অবশ্যই গণমাধ্যম ন্যায়ের পক্ষে বলবে। তাহলে নিরপেক্ষ শব্দটি এখানে ব্যবহার করা যুক্তিযুক্ত কীনা?
আমার আজকের লেখার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, ১৫ ফেব্রুয়ারী ছিল দৈনিক ভোরের কাগজের ২৫ বছর পূর্তি উৎসব। পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন উপলক্ষে লক্ষ্মীপুরে স্থানীয় প্রতিনিধির উদ্যোগে আলোচনা সভা এবং র্যালির আয়োজন করা হয়। আলোচনায় বক্তাদের কয়েকজন পত্রিকাটির নিরপেক্ষ ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন। ভোরের কাগজের স্লোগান ছিল, ১। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় তারুণ্যের জয়গান, ২। মুক্ত প্রাণের প্রতিধ্বনি।
এই দুটি স্লোগান বিশ্লেষন করে আমি যেটি বুঝেছি, একটি হলো মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেওয়া আরেকটি হলো সংবাদ মাধ্যম বা সংবাদ কর্মীর স্বাধীনতা। পত্রিকাটি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জয়গান করবে এবং প্রভাবমুক্ত হয়ে সংবাদ প্রকাশ করবে।
একাত্তরে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। স্বাধীনতার ৪৬ বছর পার করলাম আমরা। আমরা কেন স্বাধীন হলাম? স্বাধীনতার মূলমন্ত্র কী ছিল? এ নিয়ে বিশ্লেষন করলে অনেক পিছনে যেতে হবে। আমার সার কথা হচ্ছে, এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার মানে এই নয় যে আমরা নিরপেক্ষতা দেখিয়ে সত্য অবলোকন করব। যেদেশ স্বাধীনতা লাভ করতে লক্ষ লক্ষ তাজা প্রাণ শহীদ হয়েছে। সেদেশে সবকিছুই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বেড়ে ওঠবে, এটাই প্রত্যাশা।
গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করবে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এগিয়ে যাবে এটি জাতির প্রত্যাশা। এখানে নিরপেক্ষতার কোনো সুযোগ নেই। নিরপেক্ষ থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পরিপন্থীরা প্রতিষ্ঠিত হবে তা হতে পারেনা। অথচ আমাদের দেশে কত মত ও পথের অনুসারী গণমাধ্যম প্রকাশিত হয়ে আসছে। যারা নিরপেক্ষতার খোলস পরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর এজেন্ডা বাস্তবায়নে নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন নিয়োগে চার্চ কমিটি গঠন করেন রাষ্ট্রপতি। চার্চ কমিটির সাথে আলোচনায় অংশ নেওয়া বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলের বক্তব্য ছিল, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী ব্যক্তিদের নিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হবে। চার্চ কমিটির দেওয়া সুপারিশের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ সাবেক সচিব কে এম নুরুল হুদাকে সিইসি নিয়োগ করেন এবং আরো চারজনকে কমিশনার নিয়োগ দেন।
এতে আপত্তি তোলেন বিএনপিসহ তাদের জোটভুক্ত দলগুলো। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, কে এম নুরুল হুদা নিরপেক্ষ নন। তিনি আওয়ামী লীগের লোক। কী কারণে তিনি আওয়ামী লীগের লোক? কে এম নুরুল হুদা ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু সরকারের নিয়োগকৃত প্রশাসন ক্যাডার। কে এম নুরুল হুদা বিগত বিএনপি সরকারের সময় ওএসডি ছিলেন। সম্ভবত এ কারণেই তিনি নিরপেক্ষ নন বলে বিএনপি মনে করে।
যদি এ কারণেই বিএনপির বক্তব্য হয়, কে এম নুরুল হুদা নিরপেক্ষ নয়। তাহলে বক্তব্যটি কতটুকু গ্রহণযোগ্য? মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী লোক বলেই যদি তিনি নিরপেক্ষ না হন বা আওয়ামী লীগের লোক হন তাহলে রাষ্ট্রপতির করার কিছু আছে বলে মনে করিনা। কারণ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে কাজ করলে যদি সেটা আওয়ামী লীগের পক্ষে যায় সেটি কে এম নুরুল হুদার জন্য মহাভারত অশুদ্ধ হবেনা।
এখানে একটি কথা বলে রাখা প্রয়োজন, ১৯৯০ সালে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের পর আওয়ামী লীগের প্রস্তাবনায় কিন্তু বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহম্মদকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি নিয়োগ করা হয়েছিল। বিচারপতি সাহাবুদ্দিন সরকার কর্তৃক ১৯৯১ সালের নির্বাচনে ক্ষমতায় এসেছিল বিএনপি।