আকাশবার্তা ডেস্ক :
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, একুশে আগস্টের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ে যাবজ্জীবন দণ্ড পাওয়া বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দল থেকে পদত্যাগের করা প্রশ্নই আসে না।
শুক্রবার (১২অক্টোবর) রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির দলীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমান, আবদুস সালাম, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবীর খোকন প্রমুখ।
ফখরুল বলেন, ‘২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালতের বক্তব্যের সঙ্গে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের বক্তব্যের মিল রয়েছে, যা কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। তাই এ নিয়ে তারেক রহমানের পদত্যাগেরও কারণ নেই।’
ফখরুল আরো বলেন, ‘গ্রেনেড হামলায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড যদি রাষ্ট্রযন্ত্রের হয়, তাহলে বর্তমান সরকারের আমলে পিলখানা হত্যাকাণ্ড, হলি আর্টিজান এবং জঙ্গি হামলায় নিহত বিদেশি কূটনৈতিক ব্যবসায়ী, এনজিও কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ইমাম-মুয়াজ্জিন, যাজক, পুরোহিত, ব্লগার হত্যাসহ সব হত্যাকাণ্ডের দায় ক্ষমতাসীনদের ওপরই বর্তায়। কিন্তু রায়ের পর্যবেক্ষণে এসব বিষয়ে কোনো উল্লেখ নেই।’
এসময় ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়কে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রতিফলন বলে মন্তব্য করেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
‘এ রায় গ্রহণযোগ্য নয়’—এমন মন্তব্য করে মির্জা ফখরুল আরো বলেন, ‘রাষ্ট্রযন্ত্রের সাহায্যে হামলা হয়েছে বলে আদালতের যে পর্যবেক্ষণ তা যুক্তিগ্রাহ্য বা গ্রহণযোগ্য নয়। মুফতি হান্নানের বেআইনি দ্বিতীয় জবানবন্দি বাদ দিলে তারেক রহমান বা অন্য অনেক ব্যক্তিকেই এই মামলায় অভিযুক্ত করা যেত না। যৌক্তিক কারণেই বলা যায়, প্রকাশ্য আদালতে মুফতি হান্নান যাতে বলতে না পারেন যে, তাঁকে দিয়ে জোর করে জবানবন্দিতে সক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, সে জন্যই একটি মামলায় দ্রুততার সঙ্গে তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে।’
বিএনপি মহাসচিব বলেন, রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ১৯৭১ এর পরাজিত শক্তি এদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ব্যাহত করার অপচেষ্টা চালাতে থাকে। পরাজিত শক্তি ঐক্যবদ্ধভাবে ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা করে স্বাধীন বাংলাদেশের উন্নয়নের গতিকে রোধ করে। জাতির পিতাকে হত্যার পর জাতীয় ৪ নেতাকে হত্যা করা হয়। কিন্তু ষড়যন্ত্র থেমে না গিয়ে চলমান থাকে। ‘২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার হীন চেষ্টা চালানো হয়’ বলেও আদালতের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, আদালতের এসব পর্যবেক্ষণ ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বক্তব্য হুবহু এক। ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্টের নৃশংস হত্যাকাণ্ড, জেলখানায় ৪ জাতীয় নেতার বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড এবং ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মতো ঘৃণ্য অপরাধকে একসূত্রে গাঁথার যুক্তি সঠিক হলে বিএনপি কিংবা বিএনপি পরিচালিত রাষ্ট্রযন্ত্রকে অপরাধী বলা হলো কোন যুক্তিতে? ১৯৭৪ সালে বিএনপি’র জন্মও হয়নি এবং ১৫ আগস্ট কিংবা ৩ নভেম্বরের হত্যাকাণ্ডের বিচারে কোনো আদালতই বিএনপি কিংবা এ দলের কোনো নেতাকে অভিযুক্ত-এমনকি সম্পৃক্তও করেনি।
মির্জা ফখরুল প্রশ্ন রেখে বলেন, তাহলে ২১ আগস্টের ঘটনার বিচারের পর্যবেক্ষণে আগের ২টি ঘটনার উল্লেখ কতটা প্রাসঙ্গিক? দল বিশেষের রাজনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গে আদালতের পর্যবেক্ষণ মিলে যাওয়া কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয় বলেই জনগণ মনে করে।
‘অন্যদিকে হুজি নেতা মুফতি হান্নান শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মুখে যে জবানবন্দি দিয়েছিলেন তা তিনি প্রকাশ্য আদালতে লিখিতভাবে প্রত্যাহার করে নেওয়ার পরেও তারই জবানবন্দিকে ভিত্তি করে তারেক রহমান ও অন্যান্য বিএনপি নেতাকে অভিযুক্ত করে শাস্তি দেওয়াটা কতটা মানবিক এবং যুক্তিযুক্ত কিংবা আইনসঙ্গত হয়েছে তা উচ্চ আদালত বিবেচনা করবেন বলে আমরা আশা করি’।
আদালতের পর্যবেক্ষণে বিরোধী দলের প্রতি সরকার ও সরকারি দলের প্রত্যাশিত আচরণ সম্পর্কে যেসব বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে, তা বর্তমানে ক্ষমতাসীন সরকারি দলের আচরণের ঠিক বিপরীত মন্তব্য করে বিএনপির এ অন্যতম শীর্ষ নেতা বলেন, আমরা আশা করবো সরকার আদালতের এসব পর্যবেক্ষণ মান্য করবে।
রায়ের পর্যবেক্ষণে সাবেক মন্ত্রী এস এম এ কিবরিয়া ও আহসান উল্লাহ মাস্টারের হত্যাকাণ্ডের উল্লেখ থাকলে ও বিচারকের বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি সরকারি দলের আচরণ কেমন হওয়া উচিৎ, সে সম্পর্কে দেয়া পর্যবেক্ষণে বর্তমান সরকারের আমলে সাবেক মন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমেদ, সংসদ সদস্য এম ইলিয়াস আলী ও সাইফুল ইসলাম হিরু, কাউন্সিলর চৌধুরী আলম, ছাত্রদল নেতা জাকিরসহ গুম হওয়া রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের কোনো কথা নেই কেন জনগণ তা জানতে চাইতেই পারে।
রায়ের পর্যবেক্ষণে কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে গত ১০ বছরে হাজারো গুম, খুন, গায়ে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করে পঙ্গু করা, হাজার হাজার গায়েবী মামলা দিয়ে লাখ লাখ বিএনপি নেতাকর্মীদের বছরের পর বছর ঘরছাড়া করে রাখা, গ্রেপ্তার করে রিমাণ্ডে নিয়ে অকথ্য নির্যাতন করার বিষয়ে কোনো কথা না থাকা রায়কে প্রশ্নবিদ্ধ করতেই পারে।
মির্জা ফখরুল বলেন, বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকাকালে সংঘটিত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের দায়িত্ব যদি রাষ্ট্রযন্ত্রের হয়, তাহলে বর্তমান সরকারের শাসনামলে পিলখানা বিডিআর সদর দফতরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, হলি আর্টিজানে হত্যাকাণ্ড এবং জঙ্গি হামলায় নিহত বিদেশি কূটনীতিক, ব্যবসায়ী, এনজিও কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ইমাম-মোয়াজ্জিন, যাজক, পুরোহিত, ব্লগারসহ অসংখ্য সাধারণ মানুষের হত্যাকাণ্ডের দায় ক্ষমতাসীনদের ওপরই বর্তায়। কিন্তু রায়ের পর্যবেক্ষণে এসব বিষয়ে কোনো উল্লেখ নেই।
মিডিয়াকে আরও দায়িত্বশীল হবে এমন আশা প্রকাশ করে বিএনপির মহাসচিব বলেন, ২১ আগস্টের নৃশংস ঘটনার সুবিচার নিশ্চিত করার জন্য তৎকালীন সরকারই মামলা দায়ের করেছে। নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য এফবিআই ও ইন্টারপোলকে তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছে, বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি করেছে। এ মামলার মূল আসামি মুফতি হান্নানকে গ্রেফতার করেছে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে তৎকালীন সরকার অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল না। কাজেই রাষ্ট্রযন্ত্রের সহায়তায় হামলা হয়েছে বলে আদালতের যে পর্যবেক্ষণ -তা যুক্তিগ্রাহ্য ও গ্রহণযোগ্য নয়।
মির্জা ফখরুল বলেন, মুফতি হান্নানের বেআইনি ২য় জবানবন্দি বাদ দিলে তারেক রহমান ও অন্য অনেক উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিকেই এ মামলায় অভিযুক্ত করা যেতো না। প্রকাশ্য আদালতে মুফতি হান্নান যাতে তাকে দিয়ে জোর করে জবানবন্দিতে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে, এটা বলতে না পারেন সে জন্যই অন্য একটি মামলায় দ্রুততার সঙ্গে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। আদালতের পর্যবেক্ষণে এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির কোনো উল্লেখ না থাকাও বিস্ময়কর ও সন্দেহমূলক।
উল্লেখ্য, গত ১০ অক্টোবর ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় ঘোষণা হয়। রায়ে বিএনপি-জামায়াতের ১৯ নেতাকর্মীকে ফাঁসির দণ্ডাদেশ দেওয়া হয়। এ ছাড়া বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেন আদালত।
সূত্র : দৈনিক আমার সংবাদ