আকাশবার্তা ডেস্ক :
ঈদের আভিধানিক অর্থ- ঈদ শব্দটি বাবে নাসারা এর মাসদার। এর আভিধানিক অর্থ প্রত্যাবর্তন করা, আনন্দ, ফিরে আসা। পারিভাষিক সংজ্ঞা: পরিভাষায় ঈদ বলা হয় ঈদ এমন প্রতিটি দিনকে বলা হয়, যে দিন কোনো প্রিয় ব্যক্তি কিংবা শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তির স্মরণে উৎসব পালন করা হয়। কারো কারো মতে– যে দিনসমূহে মুসলমানগণ উৎসব পালন করে, তাকেই ঈদ বলে। সূত্র: আল-আকায়েদ ওয়াল ফিকহ। দাখিল অষ্টম শ্রেণি। মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সংজ্ঞা: মীলাদ শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে (আরবী) বেলাদত শব্দটি থেকে।
সুতরাং আরবী ভাষায় মীলাদ শব্দটির অর্থ জন্মের স্থান ও সময়। শরীয়তের আলোকে আমরা বুঝি, মহানবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তাফা (সা.) এঁর ধরাধামে শুভাগমনের সময় যেসব ঘটনা ঘটেছিল, তা-ই হচ্ছে মীলাদ-এ মুস্তাফাবা মীলাদুন্নবী (সা.) আর আমরা এই শুভলগ্নে তাঁর শান ও মান ইজ্জত তাজিম ইসলামে অবদান ইত্যাদি আলোচনার সুযোগও পেয়ে থাকি। এছাড়াও মীলাদ শরীফে আমরা মহানবী (সা.) এঁর প্রতি তাজিম সহকারে হাদিয়া হিসেবে দরুদ ও সালাম পেশ করে থাকি। মানুষের কাছে প্রিয়নবী (সা.) এঁর অনুপম বৈশিষ্ট্যাবলী বর্ণনা এবং তাঁর প্রশংসাও করা হয়। আমরা বিশ্বাস করি না যে মীলাদ মাহফিল কোনো নির্দিষ্ট দিনে সীমাবদ্ধ রাখা চাই, বরং রাসূলুল্লাহ (সা.) এঁর জিকির-তাযকেরা (স্মরণ) প্রতিটি মিনিট ও প্রতিটি সেকে-েই করা চাই। মীলাদ-এ- মুস্তাফা বা মীলাদুন্নবী (সা.) হচ্ছে ধর্মপ্রচারের এক মহা উৎস। এটি দাওয়াহ কার্যক্রমের একটি মোক্ষম সুযোগ এবং এই শুভলগ্নে উলামাবৃন্দ মুসলমানদেরকে ধর্মশিক্ষা দিতে পারেন; মহানবী (সা.) এঁর নৈতিক আচার- ব্যবহার, সৌজন্য তাঁর বিষয়াদি ও পবিত্র জীবনী সম্পর্কেও উম্মতে মুহাম্মদি শিক্ষা লাভ করতে পারেন।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) কি নিজের মীলাদ নিজে পালন করতেন? হাদিসের আলোকে মীলাদুন্নবী (সা.) উদযাপনের শরীয়তের বৈধতা: হুজুর পুর নূর দোজাহানের বাদশাহ তাজেদারে কায়েনাত মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সা.) এঁর মতামত জানতে চেষ্টা করি, যিনি স্বয়ং নিজের মীলাদ শরীফ নিজেই পালন করতেন। হাদীসগ্রন্থ সহীহ মুসলিম শরীফে বর্ণিত হয়েছে:- অনুবাদ: হযরত আবু কাতাদা আনসারী (রা.) রেওয়াত করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) কে জিজ্ঞেস করা হয়, কেন তিনি প্রতি সোমবার (নফল) রোযা রাখেন।
জবাবে তিনি বলেন, এই দিনে আমার বেলাদত পাক (তথা ধরাধামে শুভাগমন) হয়েছে এবং আমার প্রতি ওহী (ঐশী বাণী) ও অবতীর্ণ হয়েছে এই দিনেই। তথ্য সূত্র: (ক) সহীহ মুসলিম, ৬ষ্ঠ খ-, হাদীস নং ২৬০৬; ২৬০৩ হাদীসেও বিদ্যমান। (খ) আসাদ আল-গাবা ফী মা’আরফাতেস সাহাবা, ১ম খ-, ২১-২২ পৃষ্ঠা; ১৯৮৭ সালে লাহোর, পাকিস্তানে প্রকাশিত। (গ) ইমাম বায়হাকী কৃত সুনানে কুবরা, ৪র্থ খ-, ৩০০ পৃষ্ঠা, হাদীস নং ৮১৮২ ও ৮২৫৯। (ঘ) মোসান্নাফে আব্দ আল-রাযযাক, ৪র্থ খ-, ২৯৬ পৃষ্ঠা হাদীস নং ৭৮৬৫। (ঙ) সুনানে আবি দাউদ, ৭ম খ-, ২৫৫ পৃষ্ঠা, হাদীস নং ২৪২৮। (চ) মুসনাদে আহম্মদ, ৪৯তম খ-, ১৯৫ পৃষ্ঠা, হাদীস নং ২৩২০০। (ছ) সুনানে ইমাম নাসাঈ। মহানবী (সা.) যখন বাৎসরিক নয়, বরং প্রতি সোমবার নিজের মীলাদ শরীফ (জন্মদিবস) উদযাপন করেছেন।
তখন কীভাবে একে শিরক বা বেদআত আখ্যা দেয়া যায়? এই হাদীস শরীফ থেকে স্পষ্ট যে, তিনি হুজুর পাক (সা.) বেলাদত দিবস সম্পর্কে খুব খুশি ছিলেন এবং কৃতজ্ঞতাস্বরূপ সে দিনটিতে রোযা রাখতেন। রোযা এক ধরনের ইবাদত, আর তাই অন্য কোনো ধরনের ইবাদত- বন্দেগী দ্বারা কেউ এদিনটিকে পালন করতে পারেন। মুসলমানবৃন্দ রোযা রাখতে পারেন, ধর্মীয় জমায়েত করতে পারেন, গরিবদের মাঝে খাবার বিতরণও করতে পারেন; এগুলোর সবই ইবাদত হিসেবে পরিগণিত। আপনি যদি কাউকে জিজ্ঞেস করেন কেন তিনি কোনো বিশেষ ধরনের (নফল) ইবাদত পালন করেন বা রোযা রাখেন অথবা কুরআন পাক তেলাওয়াত করেন? এমতাবস্থায় আপনি বাস্তবে হুজুর পাক (সা.) সেই আমল তথা (পূণ্যদায়ক) কর্মের নিয়্যত (উদ্দেশ্য) সম্পর্কেই প্রশ্ন করে থাকেন।
তাই সাহাবা-এ- কেরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) যখন মহানবী (সা.) কে রোজ সোমবার দিনকে নির্দিষ্ট করে (নফল) রোযা রাখার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেন, তখন হুজুর পাক (সা.) প্রদত্ত উত্তর থেকে আমরা হুজুর পাক (সা.) এঁর নিয়্যত (উদ্দেশ্য) সম্পর্কে জানতে পারি; মহানবী (সা.) ইরশাদ ফরমাইলেন যে, এই দিনে আমার বেলাদত শরীফ (এই জগতের বুকে শুভাগমন) হয়েছে এবং আমার প্রতি ওহী (ঐশী বাণী) ও অবতীর্ণ হয়েছে। হুজুর পুর নূর দোজাহানের বাদশাহ তাজেদারে কায়েনাত মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বয়ং মসজিদের মেম্বর শরীফে উঠে দাঁড়িয়ে সাহাবা-এ-কেরাম (রা.) এর মহা সমাবেশে নিজের পবিত্র বেলাদত ও (অনুপম) বৈশিষ্ট্যাবলী সম্পর্কে আলোচনা ও তাযকেরা (স্মরণ) করেছিলেন। এই ঘটনায় প্রমাণিত হয় যে মীলাদ-মুস্তাফা (সা.) পাঠ করা খোদ রাসূলে খোদা (সা.) এঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত।
এতদসংক্রান্ত কতিপয় প্রসিদ্ধ হাদীস শরীফ এখানে পেশ করা হলো:- (১) একদা হযরত আব্বাস (রা.) হুজুর পাক (সা.) এঁর দরবার পাকে হাজির হন। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল তিনি (হুজুর রাসূলে পাক (সা.) এঁর মহান শান পাকে ভাল কিছু শ্রবণ করেন নি) কিছু শুনেছিলেন। অতঃপর প্রিয় নবী করীম (সা.) মেম্বর শরীফে উঠে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করলেন, আমি কে? সাহাবারা (রা.) বললেন, আপনি আল্লাহর রাসূল (সা.)। হুজুর পাক (সা.) বললেন, আমি মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আব্দুল মুত্তালিব (আ.) আল্লাহ পাক মানুষ সৃষ্টি করে আমাকে তাদের মধ্য হতে প্রেরণ করেছেন; অতঃপর তিনি তাদেরকে দুটো দলে বিভক্ত করেছেন এবং আমাকে সেরা দল হতে আবির্ভূত করেছেন।
অতঃপর তিনি তাদেরকে বিভিন্ন গোত্রে পরিণত করেছেন এবং আমাকে সেরা গোত্রে আবির্ভূত করেছেন; আর তিনি তাদেরকে বিভিন্ন পরিবারে পরিণত করে আমাকে শ্রেষ্ঠ পরিবার ও শ্রেষ্ঠ বংশধারায় প্রেরণ করে সেরা বৈশিষ্ট্য দ্বারা বিভূষিত করেছেন। আবু ঈসা এই হাদীস শরীফকে হাসান বলেছেন।
তথ্য সূত্র: (ক) তিরমিযী শরীফ:- আস-সুনান, কিতাবুল মানাকিব, বাবু ফদ্বলিন নবী, ১২-৫৪ হাদিস নং ৩৫৪১। (খ) তাবরিয়া: মিশকাতুল মাসাবীহ, বাবু ফদ্বলি সায়্যাদিল মুরসালীন, পৃষ্ঠা নং ২৫১, হাদিস নং ৫৭৫৭। (গ) আহম্মদ ইবনে হাম্বল: আল-মুসনাদ, বাবু হাদিসী আব্বাস ইবনে আবদিল্লাহ, ৪২১৯, হাদীস: ১৬৯২। (২) ওয়াসেলা ইবনে আল-আসকা বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ ফরমান: সর্ব শক্তিমান মহান আল্লাহ পাক হযরত ইব্রাহীম (আ.) এঁর আল-আওলাদ (সন্তান) হযরত ইসমাইল (আ.) এঁর বংশধরদের মাঝে কানানা গোত্রকে বেছে নিয়েছেন; কানানা গোত্রের মাঝ হতে কোরাইশ গোত্রকে বেছে নিয়েছেন; কোরাইশের মাঝ হতে বনু হাশিম (আ.) এঁর পরিবারকে আর আমাকে হাশিম (আ.) এঁর পরিবারের মাঝ হতে বেছে নিয়েছেন।
আবু ঈসা বলেন যে, এ হাদীস খানি হাসান ও সহীহ। তথ্য সূত্র: (ক) সহীহ মুসলিম শরীফ: আস সহীহ, বাবু ফদ্বলিনসবিন নবী, ১১;৩৮০, হাদীস নং ৪২২১। (খ) তিরমিযি শরীফ: আস-সুনান বাবু ফী ফদ্বলিন নবী, ১২;৫১, হাদীস নং ৩৫৩৮। (গ) তাবরিয়া: মিশকাতুল মাসাবীহ, বাবু ফাদ্বায়িলি সায়্যিদিল মুরসালিন, পৃষ্ঠা ২৪৮, হাদীস নং ৫৭৪০। (ঘ) ইমাম আহম্মদ ইবনে হাম্বল: আল-মুসনাদ, বাবু হাদীসী ওয়াসালা ইবনে আসকাহ, ৩৪;৩৪৮, হাদীস নং ১৬৩৭২। (৩) হুজুর পাক (সা.) ইরশাদ ফরমান যে, আমার আম্মাজান হযরত বিবি আমিনাহ (আ.) আমাকে বেলাদতের মওকায় বা (জন্মকালীন লগ্নে) তিনি তাঁর কাছ থেকে বিচ্ছুরিত এক নূর (জ্যোতি) নূরে মুহাম্মদী (সা.) দেখতে পান, যা দ্বারা সিরিয়ার রাজ প্রাসাদগুলোও তাঁর সামনে দৃশ্যমান হয়।
তথ্য সূত্র: (ক) ইবনে হাশিম; তাফসীরে ইবনে কাসীর ৪;৩৬০। (খ) বায়হাকী, দালাইল আন-নুবুওয়্যা, ১;১১০। (গ) হায়তামী, যাওয়াঈদ, ৮;২২১। (ঘ) ইবনুল জাওযী আল-ওয়াফা। (৪) হুজুর পাক (সা.) ইরশাদ ফরমান যে, মহান আল্লাহ পাক সর্বপ্রথম যা সৃষ্টি করেন, তা হচ্ছে আমার নূর (জ্যোতি) নূরে মুহাম্মদী (সা.)। তথ্য সূত্র: (ক) তাফসীরে নিশাপুরী, ৫৫ পৃষ্ঠা ৮ম খ-। (খ) তাফসীরে আরাইসুল বয়ান, ২৩৮ পৃষ্ঠা ১ম খ-। (গ) তাফসীরে রুহুল বয়ান, ৫৪৮ পৃষ্ঠা ১ম খ-।
সুতরাং ভালোভাবে লক্ষ্য করুন এই হাদীস পাক প্রমাণ করে যে হুজুর পাক (সা.) নিজেই মীলাদে হাজির ছিলেন পড়েছেন ও বর্ণনা করেছেন ইহা হুজুর পাক (সা.) এঁর খাস সুন্নাত সুন্নাতে মুস্তাফা (সা.)। আমরা যেন যুগ যুগ ধরে পালন করতে পারি মহান আল্লাহ পাক আমাদেরকে কবুল করেন। আমীন ছুম্মা আমীন।
লেখক ও গবেষক : আঞ্জুমান-ই-ক্বাদরীয়া মাদ্রাসাতু সাবি-ইল-হাসান দাখিল মাদ্রাসা, দৌলতদিয়া, গোয়ালন্দ, রাজবাড়ী।