আকাশবার্তা ডেস্ক :
কারা অধিদপ্তরের ডিআইজি প্রিজন্স বজলুর রশীদকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
রোববার (২০ অক্টোবর) তাকে আদালতে হাজির করা হয়। মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের উপপরিচালক নাসির উদ্দিন।
অপরদিকে তার আইনজীবী জামিনের আবেদন করেন। শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক আল মামুন জামিন আবেদন নাকচ করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
রোববার সকাল ১০টায় বজলুর রশীদ ও তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকে দুদক। জিজ্ঞাসাবাদের পর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
দুদক সূত্র জানায়, বজলুর রশীদ ও তার স্ত্রী রাজ্জাকুন নাহারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগে সকালে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হয়। দুদকের পরিচালক মোহাম্মদ ইউসুফের নেতৃত্বে একটি টিম তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে।
দুদকের কাছে অভিযোগ ছিল, ঘুষের কোটি কোটি টাকা কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে আসতো রশীদের কাছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাঠানো এসব টাকা তুলেছেন তার স্ত্রী রাজ্জাকুন নাহার। জিজ্ঞাসাবাদে বজলুর সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় তার বিরুদ্ধে মামলা করে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারের আগে তার বিরুদ্ধে কমিশনের সম্মিলিত জেলা কার্যালয়-১ এ দুদকের উপপরিচালক মো. সালাহউদ্দিন বাদী হয়ে এ বিষয়ে একটি মামলা দায়ের করেন।
গ্রেপ্তারের পর দুদক সচিব দিলোয়ার বখত বলেন, ‘ঘুষ লেনদের অভিযোগে আজ জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া ফ্ল্যাটের বিষয়ে রূপায়ন হাউজিং থেকেও সত্যতা পাওয়া যায়। জিজ্ঞাসাবাদে এর উৎসের যথাযথ ব্যাখ্যা দিতে পারেননি তিনি। তাই দুদক আইনে মামলা দায়ের হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘তদন্তে তার বিরুদ্ধে যদি আরো অবৈধ সম্পদের সন্ধান পাওয়া যায়, তাহলে আইন অনুসারে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদের তথ্য পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
মামলার এজাহারে বলা হয়- বজলুর রশীদ রূপায়ন হাউজিং স্টেট থেকে ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী রোডের ৫৫/১ (পুরাতন) ৫৬/৫৭ (নতুন) নির্মাণাধীন স্বপ্ন নিলয় প্রকল্পের ২৯৮১ বর্গফুট আয়তনের এ্যাপার্টমেন্ট ক্রয় করেন। ইতোমধ্যে তিনি এ্যাপার্টমেন্টের মূল্যবাবদ তিন কোটি আট লাখ টাকা পরিশোধ করেন।
মামলায় আরো বলা হয়-এই এ্যাপার্টমেন্ট ক্রয়বাবদ বজলুর রশীদ যে টাকা পরিশোধ করেছেন, এর সপক্ষে কোনো বৈধ উৎস প্রদর্শন করতে পারেননি। এমনকি তিনি এ্যাপার্টমেন্টের ক্রয় সংক্রান্ত কোনো তথ্য তার আয়কর নথিতে প্রদর্শন করেননি। ফলে তার এই পরিশোধিত তিন কোটি আট লাখ টাকা জ্ঞাত আয় উৎসের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ। যা তিনি অসাধু উপায়ে অর্জন করেছেন, এই অভিযোগে দুদক আইন ২৭ (১) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
২০১৮ সালের ২৪ এপ্রিল এ্যাপার্টমেন্ট ক্রয়ের জন্য রূপায়ন হাউজিং স্টেটের সাথে তিনি চুক্তি করেছিলেন। এরপর ২০১৮ সালের ৭ জুন পর্যন্ত ৫৪ হাজার টাকা ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের মাধ্যমে চেকে পরিশোধ করেন। আর বাকি তিন কোটি সাত লাখ ৪৬ হাজার নগদে পরিশোধ করেন। কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে ঘুষের কোটি কোটি টাকা লেনদেন ও অবৈধ সম্পদের রহস্য উন্মোচনে বজলুর রশীদ ও তার স্ত্রী রাজ্জাকুন নাহারকে রোববার সকাল থেকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদক।
কারা ক্যাডারের ১৯৯৩ ব্যাচের কর্মকর্তা বজলুর রশীদ এখন ঢাকায় কারা সদর দপ্তরে দায়িত্ব পালন করছেন। ডিআইজি হিসেবে এর আগে সর্বশেষ রাজশাহীতে ছিলেন। তিনি জেল সুপার পদে বরগুনায় কর্মজীবন শুরু করেন।
এরপর সিরাজগঞ্জ, কুষ্টিয়া, কক্সবাজার ও খাগড়াছড়ি এবং জ্যেষ্ঠ জেল সুপার হিসেবে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে কর্মরত ছিলেন।
সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। দুদক পরিচালক মুহাম্মদ ইউসুফের নেতৃত্বে উপপরিচালক মো. নাসিরউদ্দিন ও মো. সালাহউদ্দিন কাজ করেন। অভিযোগ রয়েছে বিপুল পরিমাণ ঘুষের টাকা স্থানান্তর করতে ডিআইজি প্রিজন (হেডকোয়ার্টার্স) বজলুর রশীদ কুরিয়ার সার্ভিসকে বেছে নিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে সূত্র জানায়, তার স্ত্রী রাজ্জাকুন নাহারের নামে ২০১৭ সাল থেকেই মোবাইল নম্বরের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকা লেনদেন হয়েছে।
এর মধ্যে গত ২০ জানুয়ারি ৯৫৮৮২৫ রসিদে ৫০ হাজার টাকা, ১৭ ফেব্রুয়ারি ৯৫৮১০৮ রসিদে এক লাখ দুই হাজার টাকা, ২৪ ফেব্রুয়ারি ৯৫৮১৪৩ রসিদে দুই লাখ টাকা, ২০ মে ৯৫৯০৬০ রসিদে এক লাখ টাকা, ২৩ মে এক লাখ ১৫ হাজার টাকা, ২৭ মে ৯৫৯১৪১ রসিদে এক লাখ ৯৮ হাজার ৩৫০ টাকা, ৬ জুলাই ৯৫৯৪৬৯ রসিদে তিন লাখ টাকা, ১৪ জুলাই ৯৫৮৯৭২ রসিদে এক লাখ টাকা, ২২ জুলাই ৯৫৯৫১২ রসিদে ১০ লাখ ১০ হাজার, ১৬ জুলাই ৯৫৯৪৭০ রসিদে তিন লাখ টাকা, ৪ মার্চ ৯৫৮২১৮ রসিদে দুই লাখ টাকা, ২৬ সেপ্টেম্বর ৯৫৯৫৪১ রসিদে ১১ লাখ ৫০ হাজার টাকা, ৪ অক্টোবর ৯৫৯৭৪৯ রসিদে ছয় লাখ টাকা তার স্ত্রীর কাছে পাঠানো হয়।
২০১৮ সালের ৮ ডিসেম্বর ৯৫৮৪৮১ রসিদে দুই লাখ ৯৮ হাজার টাকা, ১৯ মার্চ ৯৫৮৩৪৫ রসিদে চার লাখ ৯৪ হাজার টাকা, ১১ এপ্রিল ৮৪২১২৮ রসিদে তিন লাখ টাকা, ২০ নভেম্বর ৮৪২২৩৯ রসিদে দুই লাখ ৬০ হাজার টাকা, ৩০ সেপ্টেম্বর দুই লাখ ৬০ হাজার টাকা, ৯৫৭৬৪০ রসিদে (তারিখ অস্পষ্ট) দুই লাখ টাকা, ২০১৭ সালের ৪ মার্চ ৯৫৮১৬৯ রসিদে ছয় লাখ আট হাজার টাকা, (১৬ অক্টোবর সাল অস্পষ্ট) ৮১৭২৩৮ রসিদে এক লাখ টাকা, (৮ অক্টোবর সাল অস্পষ্ট) ৮১৭১৫৭ রসিদে এক লাখ ২০ হাজার টাকা, ৯৫৯৭১৩ রসিদে (তারিখ অস্পষ্ট) ছয় লাখ ৪৪ হাজার টাকা, ২০১৭ সালের ১৪ অক্টোবর ৮১৭২১৭ রসিদে তিন লাখ টাকা, ১২ অক্টোবর ৮১৭২০৭ রসিদে পাঁচ লাখ ২০ হাজার টাকা লেনদেন করা হয়।