আকাশবার্তা ডেস্ক :
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ক্ষমতাসীন দলের এক সাংসদের মামলার পর একদিন পর নিখোঁজ হয়েছেন দৈনিক পক্ষকাল পত্রিকার সম্পাদক শফিকুল ইসলাম কাজল। মামলার ৩২ আসামির মধ্যে তিনি একজন।
শফিকুল ইসলাম কাজল নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় বুধবার (১১ মার্চ) চকবাজার থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন শফিকুল ইসলামের স্ত্রী জুলিয়া ফেরদৌসী নয়ন।
ডায়েরিতে ফেরদৌসী নয়ন বলেন, প্রতিদিনের ন্যায় ১০ মার্চ দুপুর আড়াইটার দিকে শফিকুল ইসলাম লালবাগের বাসা থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে বের হন। এরপর থেকে তার আর খোঁজ নেই।
নিখোঁজ সাংবাদিকের ছেলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মনোরম পলক। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) তিনি বলেন, পরিবারের সদস্যরা মঙ্গলবার থেকে তার কোনো খোঁজ পাচ্ছে না। তার সন্ধানে আজও (বৃহস্পতিবার) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত আমরা চকবাজার থানায় বসে ছিলাম। কিন্তু পুলিশ নতুন কিছুই জানাতে পারনি।
চকবাজার থানায় বুধবার দায়ের করা সাধারণ ডায়েরিতে কাজলের স্ত্রী জুলিয়া ফেরদৌসী বলেন, ১০ মার্চ (মঙ্গলবার) দুপুর আড়াইটার দিকে কাজল লালবাগের বাসা থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে বের হন। এরপর থেকে তার আর খোঁজ নেই।
চকবাজার থানার ওসি মওদুদ হাওলাদার বলেন, আমরা তার নিখোঁজের বিষয়ে সারাদেশে সংবাদ দিয়েছি৷ তার পরিবারের সঙ্গে কথা বলে তথ্য জানার চেষ্টা করছি৷ তার বাসা এবং সন্দেহজনক এলাকার সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজও সংগ্রহের চেষ্টা করছি৷ এর বাইরে আর কোনো অগ্রগতি নেই৷’
কাজলকে এমপির করা মামলায় আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে শেরেবাংলা থানার ওসি জানে আলম মুন্সি বলেন, এই মামলার কোনো আসামিকেই আমরা আটক বা গ্রেপ্তার করিনি৷ আর এখন মামলাটি তদন্ত করছে ডিএমপির সাইবার ক্রাইম ইউনিট৷
সাইবার ক্রাইম ইউনিটের এডিসি নাজমুল ইসলাম বলেন, মামলাটির তদন্ত ভার তাদের দেয়া হয়েছে৷ তবে কাগজপত্র এখনো হাতে না পাওয়ায় তদন্ত শুরু হয়নি৷ এরমধ্যে তাদের পক্ষ থেকে কোনো আসামিকে গ্রেপ্তারের প্রশ্নই ওঠেনা৷
কাজলের ছেলে বলেন, বাবা ফেসবুকে অনেক লেখালেখি করতেন৷ তবে এনিয়ে কখনো কোনো হুমকি পেয়েছেন বলে আমাদের জানা নেই৷ তার বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার পরও তাকে উদ্বিগ্ন হতে দেখিনি৷ মঙ্গলবার তিনি যখন বাসা থেকে বের হয়ে যান তখনও স্বাভাবিকই ছিলেন৷ আমরা পুলিশের সাথে কথা বলেছি৷ বিভিন্ন পর্যায়ে খোঁজ নিয়েছি৷ তারা জানিয়েছেন এমপির মামলায়ও বাবাকে আটক করা হয়নি৷ তাহলে বাবা কোথায় গেলেন?
এর আগে সোমবার রাতে ঢাকার শেরেবাংলা নগর থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীসহ ৩২ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন মাগুরা-১ আসনে সরকার দলীয় সংসদ সদস্য মো. সাইফুজ্জামান শেখর।
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) কেন্দ্রীয় কমিটির দপ্তর সম্পাদক আবদুল্লাহিল কাইয়ুম জানান, কাজল ‘পক্ষকাল’ নামে একটি পাক্ষিক পত্রিকা সম্পাদনার পাশাপাশি ফ্রিল্যান্স ফটো সাংবাদিক হিসেবেও কাজ করতেন। এর আগে তিনি নিউ এজ, সমকাল ও বণিক বার্তাসহ বিভিন্ন পত্রিকায় কাজ করেছেন।
কাইয়ুম জানান, সাম্প্রতিক সময়ে কাজল দুর্নীতির বিরুদ্ধে ফেসবুকে খুব সোচ্চার ছিলেন।
ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন ফটো সাংবাদিক কাজলকে দ্রুত উদ্ধার করে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার দাবি জানিয়েছে৷ সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ আলম খান বলেন, কোনো সভ্য সমাজে সাংবাদিক কেন, কোনো নাগরিকের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নিন্দনীয়৷ নাগরিকদের নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের৷ আমরা কাজলকে দ্রুত উদ্ধার করে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার দাবি জানাই৷
এদিকে সাংসদ শিখরের দায়ের করা মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, গত ২ মার্চ দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীর নির্দেশে আল আমিন নামের এক প্রতিবেদক ‘পাপিয়ার মুখে আমলা, এমপি, ব্যবসায়ীসহ ৩০ জনের নাম’ শীর্ষক সংবাদ পরিবেশন করেন।
প্রতিবেদনে ইঙ্গিতমূলকভাবে ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, নীলফামারী, রংপুর, কুষ্টিয়া ও মাগুরা জেলার একজন করে সংসদ সদস্যের নাম প্রকাশ করা হয়। এ ছাড়া সোশ্যাল মিডিয়ায় ২৫ থেকে ৩০ জনের নামসহ একাধিক তালিকা প্রকাশ করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যেখানে শিখরের নামও রয়েছে।
এ ঘটনায় মানবজমিন সম্পাদক, সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদক এবং ফেসবুকে তালিকাগুলো প্রকাশ বা শেয়ার করা ৩০ ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে এজাহারে।
বাদির দাবি, অভিযুক্তরা পারস্পরিক যোগসাজশ করে উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণা চালিয়ে তাকে সমাজে হেয় করে হীনস্বার্থ হাসিলের অপচেষ্টা করেছেন।
এদিকে মতিউর রহমান চৌধুরী ও রিপোর্টার আল-আমিনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ২০ এপ্রিল দিন ধার্য করেছে আদালত। বুধবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সরাফুজ্জামান আনছারীর আদালত মামলার এজহার আমলে নিয়ে এ আদেশ দেয়।
এবিষয়ে সংসদ সদস্য সাইফুজ্জামান শিখর বলেন, আমিও আমার মামলার একজন আসামি নিখোঁজ বলে শুনেছি৷ এটা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দেখার দায়িত্ব৷ আমার মামলায় কোনো আসামি আটক হয়েছে বলে আমার জানা নেই৷ তদন্তকারীরাও কাউকে গ্রেপ্তার করেছে বলে আমার কাছে তথ্য নেই৷
তিনি বলেন, অন্যায়ভাবে অসত্য তথ্য দিয়ে আমার চরিত্র হননের চেষ্টার অভিযোগে আমি মামলা করেছি৷ এটা আমার প্রতিবাদ৷ কোনো প্রতিশোধ নিতে আমি মামলা করিনি৷
প্রসঙ্গত, নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক শামীমা নূর পাপিয়াকে গত ২২ ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তার করে র্যাব। এরপর তার পরিচালিত পাঁচতারকা হোটেলকেন্দ্রিক যৌনতার বাণিজ্য বিষয়ক কর্মকাণ্ড প্রকাশ করা হয়। বর্তমানে অস্ত্র, মাদক ও জাল টাকার পৃথক তিন মামলায় স্বামী ও সহযোগীসহ কারাগারে আছেন তিনি।
সূত্র : দৈনিক আমার সংবাদ।