অপারেশন সার্চলাইট (ইংরেজি : Operation Searchlight) ১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া পাকিস্তানী সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত পরিকল্পিত গণহত্যা। যার মাধ্যমে তারা ১৯৭১ এর মার্চ ও এর পূর্ববর্তী সময়ে সংঘটিত … এই গণহত্যা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকদের নির্দেশে পরিচালিত হয়। যা ১৯৭০ এর নভেম্বরে সংঘটিত অপারেশন ব্লিটজ্ এর পরবর্তি অণুষঙ্গ।
রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে এবং নির্দেশে ওই সময় নিরস্ত্র বাঙালির ওপর যেভাবে নির্যাতন ও গণহত্যা চালানো হয়েছিল। ৪৬ বছর পর একই কায়দায় মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় নির্দেশে সেনাবাহিনী একই কায়দায় রোহিঙ্গা নিধন ও গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে। আরাকান প্রদেশে অর্থনৈতিক জোন করার পরিকল্পনায় একটি জাতিকে সমূলে নিশ্চিহ্ন করার রাষ্ট্র কর্তৃক পরিচালিত গণহত্যা ইতিহাসে বিরল।
দুই মাসের বেশি সময় ধরে প্রতিবেশি দেশ মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর চলছে ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’-এর নামে বর্বরোচিত নির্যাতন। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক তার দেশে বিশাল জনসমাবেশে বিরোধী দল এবং মন্ত্রীসহ উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে সু চিকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘অনেক হয়েছে, এবার থামুন।
মিয়ানমারের আয়তন ৬ লক্ষ ৭৬ হাজার বর্গমাইল। লোকসংখ্যা প্রায় ৭ কোটি। আর বাংলাদেশের আয়তন ১ লক্ষ ৪৭ হাজার বর্গমাইল, লোকসংখ্যা ১৬ কোটি। বাংলাদেশের আয়তনের চেয়ে মিয়ানমারের আয়তন প্রায় ৬ গুণ বেশি এবং জনসংখ্যা নিতান্তই কম। মিয়ানমারে অনাবাদি জমি এবং বনাঞ্চল বাংলাদেশের চেয়ে ১০ গুণ বেশি। অথচ তারা অর্থনৈতিক জোন করার জন্য আরাকান রাজ্যকে বেচে নিয়েছে। যেখানে ৫’শ বছরের অধিক সময়কাল থেকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠি বসবাস করে আসছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে অনুসন্ধানী তথ্য প্রকাশিত হয়।
তাহলে ওই রাজ্যে অর্থনৈতিক অঞ্চল করার পরিকল্পনা যে শুধু রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন তা উদ্দেশ্যমূলক ছাড়া আর কিছু নয়। মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে রোহিঙ্গা বিতাড়ণ এবং মুসলিম বিদ্বেষী মনোভাব। এর পিছনে চীনের প্রত্যক্ষ মদত স্পর্ষ্ট ফুটে উঠেছে।
এরই মধ্যে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) এর প্রধান ফিলিপ্পো গ্রান্দি রোহিঙ্গা মুসলিমদের নাগরিকত্ব দিতে মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
গণহত্যা বন্ধে বাংলাদেশসহ রাশিয়া, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, মালেয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ওআইসি এবং ওআইসিভুক্ত মুসলিম দেশগুলো মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। রোহিঙ্গা বিতাড়ণের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাংলাদেশ। সম্পূর্ণ মানবিক কারণে বাংলাদেশ সরকার তাদেরকে আশ্রয় এবং খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করলেও বাংলাদেশের মত গণবসতিপূর্ণ একটি ছোট রাষ্ট্রে এর ভার বহন করা কতটুকু সক্ষমতা আছে। যদি এই সমস্যা দীর্ঘমেয়াদি হয়, তাহলে রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশের জন্য গলার কাঁটা হয়ে দেখা দিবে।
গত একমাসে রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে প্রায় ৩ লাখের বেশি আশ্রয় নিয়েছে। এরআগেও ৪ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রিত রয়েছে। প্রায় ৮ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর বাসস্থান এবং খাদ্যের সংস্থান করা বাংলাদেশের জন্য একটি বাড়তি বোঝা ছাড়া আর কিছুই নয়। যদিও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন, ১৬ কোটি মানুষের খাদ্যের নিরাপত্তা দিতে পারলে আমরা ৫/৭ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্টির খাদ্যের নিশ্চয়তা দিতে পারব। তিনি একেবারে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সাহস করে এমন প্রশংসিত ঘোষণা দিলেও বিশ্ব সম্প্রদায় বাংলাদেশের পাশে না দাঁড়ালে অদূর ভবিষ্যতে রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরে খাদ্যের অভাবে মানবিক বিপর্যয় দেখা দেওয়ার আশঙ্কা করেছেন রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
মঙ্গলবার (১২ সেপ্টেম্বর) কক্সবাজারের মিয়ানমার সীমান্তবর্তী উখিয়া ও কুতুপালং রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবির পরিদর্শনে যান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নিজদেশ থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের অমানবিক দুঃখ-দুর্দশা দেখে জড়িয়ে ধরেন পরদেশি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় সেখানে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। আবেগে-আপ্লুত হয়ে কেঁদে ফেলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।
এ সময় তিনি মিয়ানমারের প্রতি আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানিয়ে বলেন, যতদিন মিয়ানমার সরকার তাদেরকে ফিরিয়ে না নিবে, ততদিন তিনি (বাংলাদেশ সরকার) তাদের সবধরণের সহযোগিতা দিয়ে যাবেন।
এখন সময় এসেছে, বিশ্ব বিবেককে বাংলাদেশের পাশে তথা রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। পাশাপশি মিয়ানমার সরকারকে বাধ্য করতে হবে তাদের এসব নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে। নাহলে একদিন গণহত্যার দায়ে অং সান সুচির বিচার হবে আন্তর্জাতিক আদালতে।
লেখক : মো. আলী হোসেন, সম্পাদক-আকাশবার্তাবিডি ডটকম।