টেক বার্তা :
ঠোঁটের ওপর গোফের রেখা এখনও একেবারেই অদৃশ্য। বয়সটা এখনও ষোলর আশেপাশে। আসছে বছর এসএসসিতে বসবে সে। এরই মধ্যে পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চির লিকলিকে শরীরের ছেলেটা চলে এসেছে আলোচনায়।
নাম তারিক আমিন চৌধুরী। সে সেন্ট প্লাসিড্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র।
তার কল্যাণে এর আগে মন দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা যায় এমন যন্ত্র, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন রোবট দেখেছিল সবাই। এবার যেন নিজের সৃষ্টিকে ছাড়িয়ে গেল চট্টগ্রামের এই বিস্ময় কিশোর। প্রযুক্তির সহায়তায় একটি বাল্বকে বহুমুখী ব্যবহারে রূপ দেওয়ার চেষ্টা-হয়তো বাংলাদেশে এর আগে কেউ করে দেখাতে পারেনি।
দশম শ্রেণির ছাত্র তারিককে এক্ষেত্রে সহযোগিতা করেছেন প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ প্রকৌশল বিভাগের ছাত্র শান্তনু ভট্টাচার্য।
ইলেক্ট্রনিকস পণ্য তৈরির প্রতিষ্ঠান বিএমসির ‘স্মার্ট বাল্ব’ নামের একটি বাল্ব বাজারে রয়েছে। যে বাল্বটি বৈদ্যুতিক সংযোগ ছাড়াই তিন ঘণ্টা আলো দিতে সক্ষম। সেই বাল্বকেই মূলত উন্নত পর্যায়ে রূপ দিয়েছেন তারিক ও শান্তনু।
তারিক জানান, অনেক ধরণের সেন্সর ব্যবহারের মাধ্যমে বাল্বটিকে তারা উন্নত পর্যায়ে রূপ দিয়েছে। এর মধ্যে MQ2 (গ্যাস সেন্সর), LDR (আলোর পরিমাণ নির্ণয়), PIR (তাপমাত্রা-আদ্রতা নির্ণয়ক) সহ নানা সেন্সর স্থাপন করেছে বাল্বের অভ্যন্তরে। ব্লুটুথ ও ওয়াইফাইয়ের মাধ্যমে নির্দিষ্ট অ্যাপ্লিকেশন দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে এই বাল্বকে।
তাদের প্রযুক্তিটি এখনও প্রাথমিকভাবে দেখানো হয়েছে। এরইমধ্যে এটি চট্টগ্রামের দুটি প্রযুক্তি মেলায় উপস্থাপন করা হলে বেশ সাড়া মেলে।
ইতিমধ্যে তারিকের এই প্রযুক্তিটি লুফে নিয়েছে বিএমসি। তারা তারিকদের সঙ্গে এ বিষয়ে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী বাল্বটিকে আরও উন্নতমানের ও ক্রটিমুক্ত করতে তারিকরা কাজ করবে। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান থেকে সব রকমের সুবিধা তারা পাবে। দু’য়েক মাসের মধ্যে বাল্বটিকে পরিপূর্ণতা দিতে পারবে বলে আশা তারিকের। প্রাথমিকভাবে এক লাখ বাল্ব বাজারে আনার জন্য চুক্তি হয়েছে।
তারিক বলে, ‘বাল্বটিতে আমরা এমন কিছু সেন্সর লাগিয়েছি যেগুলোর মাধ্যমে বিশ্বের যে কোন প্রান্ত থেকে নির্দিষ্ট অ্যাপ্লিকেশন দিয়ে মোবাইলের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। বাল্বটি যে ঘরে লাগানো হবে তার ১০ মিটার এলাকার মধ্যে কি ঘটছে সেই তথ্য আহরণ করতে পারবে। মোবাইলের স্ক্রিনে এসব যেকোন জায়গা থেকে দেখা যাবে। হোম সিকিউরিটি অর্থাৎ বাল্বে স্থাপিত সিসি ক্যামেরার মাধ্যম ঘরে অপিরিচিত কেউ ঢুকেছে কিনা তাও দেখা যাবে। আবার সেন্সরের মাধ্যমে আগুন ধরেছে কিনা কিংবা গ্যাস ছড়াচ্ছে কিনা দেখা যাবে। সঙ্গে অনেককিছু নিয়ন্ত্রণও করা যাবে। স্থাপিত সবকিছু থাকবে বাল্বের সঙ্গেই।’
তবে চুক্তি অনুযায়ী অনেককিছু বলতে নিষেধ রয়েছে। তারা বাল্বটির নাম দিয়েছে ‘বিএমসি সুপার স্মার্ট বাল্ব’। পরিপূর্ণভাবে তৈরি হলে এই বাল্বের দাম পড়বে তিন হাজার টাকারও কম।
কিভাবে মাথায় আসলো এমন চিন্তা? তারিকের উত্তর-সবসময় নতুন কি করা যায় তা নিয়ে ভাবি। একদিন রিকশা করে কাজে যাচ্ছিলাম, এসময় মাথায় আসে এটি। পরে শান্তুনু ভাইয়ের সঙ্গে শেয়ার করি। এরপর দুজন মিলে কয়েকমাসে এই পর্যায়ে রূপ দিই বাল্বটিকে।
তারিকের ভাষায়, আমার সকল কিছুর অনুপ্রেরণা নানা ডায়মন্ড গ্রুপের পরিচালক আজিম আলি। সঙ্গে বাবা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আমিন আহমেদ এবং মা পারভীন আক্তার তো আছেনই।
ছেলেটা বিজ্ঞান ছাড়া কিছু বুঝে না। স্কুলব্যাগে বই-খাতার সঙ্গে সবসময় থাকে কতো যন্ত্রপাতি।
বিষয়টি আরও পরিস্কার করা যাক।
সদ্য তো দুটো ঈদ গেল, বেড়াতে যাওয়া হয়েছে কোথাও-তারিককে বলা হলে উত্তর এলো ‘না’।
নিয়মিত খেলাধুলা করো-উত্তর বদলালো না।
তারিকের জীবনে এরকম জাগতিক কোনো আনন্দে যেন ডুবে থাকার সময় নেই। বাকি পৃথিবী ভুলে তার জীবনে একটা শব্দই আছে কেবল-‘বিজ্ঞান’।
হতে চান একজন বড় বিজ্ঞানী। হয়তো অনেকদূরই যাবে তারিক-‘বাড়ন্ত মূলা যে পত্তনেই বোঝা যায়!’
সুত্র : বাংলানিউজ২৪.কম।