আমার জন্ম একটি হতদরিদ্র পরিবারে। সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্ম নেওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়নি। মা-বাবার ছোট সন্তান। দুই বোন, পাঁচ ভাইর মধ্যে আমি সবার ছোট। বাবা নিতান্তই সল্প আয়ের একটি কাজ করে আমাদের মানুষ করেছেন। সীমিত আয় হলেও আমাদের পরিবারে সুখের অভাব ছিলনা। শিশুকাল থেকে বাবা প্যান্ট পরার অভ্যাসে মানুষ করে তুলেছেন আমাদের সব ভাইকে। মাছ-ভাত আর দুধ-ভাতের কমতি ছিলনা আমাদের সংসারে। কাড়ি কাড়ি টাকা না থাকলেও হেসে খেলে কেটেছে শৈশবকাল। কখনও বাবা আমাদের অভাব অনুভব করার সুযোগ দেননি।
টাকা ছাড়াও যে একটি পরিবার, একটি সংসার কতটা আনন্দ উপভোগের মধ্যদিয়ে জীবন কাটাতে পারে তা আমি দেখেছি। সংসার ধর্মে সম্পর্ক বা সামাজিক ক্ষেত্রে ভাই, বন্ধুর সম্পর্ক টাকা দিয়ে পরিমাপ করা যায়না। সকাল, দুপুর, রাতে তিনবেলা খাবার খেয়ে হাসি খুশিতে থাকার নামই স্বার্থক জীবন। টাকার জন্য একজন মানুষের সাথে আরেকজন মানুষের সম্পর্ক টিকে থাকা নির্ভর করতে পারেনা। অথচ স্বার্থ সংশ্লিষ্টতার কারণে মানুষ কতটা পর হতে পারে তাও আমি দেখেছি। কিছু মানুষের কাছে সম্পর্ক নয়, স্বার্থই সবচেয়ে বড়। তাদের কাছে আনুগত্যের কোন মূল্য নেই।
ক্ষমতা, পেশিশক্তি, টাকা, ধন-সম্পদ একজীবনে কতটা সুখি করতে পারে? সুখ নামের চাবিকাঠি টাকা দিয়ে কেনা সম্ভব হলে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখি তারা হতো। যাদের টাকার কোন অভাব নেই। তাহলে তারা কেন অসুখি। ব্যাংক ভর্তি টাকা, চোখ ধাঁধানো বিশাল দালান, সিন্ধুক ভর্তি স্বর্ণালংকার যাদের আছে। তারা কতটুকু সুখি আমি জানিনা। তবে আমার দেখা অনেক পরিবার আছেন যাদের ধন-সম্পদের অভাব নেই তবুও তারা সুখি নয়।
নিয়তির খেলা বোঝা খুবই দুঃসাধ্য। কারণ নিয়তি কোন মানুষ তৈরী করতে পারেন না। নিয়তি যিনি তৈরী করে দেন, তিনি মহান সৃষ্টিকর্তা। যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন, ইহকাল-পরকাল। সৃষ্টি করেছেন, বেহেস্ত-দোযখ, সৃষ্টি করেছেন আসমান-জমিন, সৃষ্টি করেছেন আঠার হাজার মাখলুক। আমরা জাগতিক জীবনে আল্লাহর কতটুকু আনুগত্য প্রকাশ করেছি? অথচ আল্লাহ একমাত্র আনুগত্য ছাড়া বান্দার কাছে আর কিছু চাননা।
নিয়তি কেউ টাকা দিয়ে পরিবর্তন করতে পারেন না। টাকা দিয়ে কেউ মৃত্যু ঠেকাতে পারেন না। টাকা দিয়ে কেউ হায়াৎ কিনতে পারেন না। তাহলে একজন মানুষকে জীবনে টাকা, ধন-সম্পদ কেন এতটা আচ্ছন্ন করে এতটা মোহিত করে তোলে। পৃথিবীর দেশে দেশে বা আমাদের সমাজে টাকা ছাড়াও একজন আরেকজনের জন্য জীবন উৎসর্গ করার বিরল ঘটনা আছে ভুরি ভুরি। পৃথিবীতে টাকা ছাড়াও ভালোবাসা এবং সম্পর্কের জন্য অনেকে অনেকের জন্য জীবন দিয়েছেন।
জাগতিক জীবনে প্রয়োজনের চেয়ে অধিক ধন-সম্পদের পিছনে আমরা না ছুটি। ধন-সম্পদ নয়, জয় হোক ভালোবাসার জয় হোক মানবতার।
লেখক : মো. আলী হোসেন, সভাপতি চন্দ্রগঞ্জ প্রেসক্লাব।