মঙ্গলবার ১৪ই এপ্রিল, ২০২৬ ইং ১লা বৈশাখ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ:
লক্ষ্মীপুরে ১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিল :   বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জুলাই যোদ্ধা ফোর্সের সংঘর্ষ : পুলিশসহ আহত ১০ চট্টগ্রাম বিভাগীয় শ্রমিক দলের সদস্য হলেন মনির আহম্মদ রাজন কফিলউদ্দিন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে স্বাধীনতা দিবস উদযাপন ঈদের আগে অস্থির মুরগির বাজার, সবজিতে স্বস্তি আজ যে দামে বিক্রি হচ্ছে সোনা ফ্লাইট বাতিলে ভিসার মেয়াদ শেষ হলে সহায়তা করবে সরকার চন্দ্রগঞ্জে অস্ত্র-গুলিসহ ৩ ডাকাত গ্রেপ্তার চন্দ্রগঞ্জ প্রেসক্লাবের উদ্যোগে ইফতার ও দোয়ার মাহফিল ভূমিকম্প মোকাবিলায় ঢাকায় ১ লাখ স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুতের নির্দেশ ইসরায়েলে ও যুক্তরাষ্ট্রে এমন হামলা হবে, যা তারা আগে কখনো দেখেনি

একজন ফওজিয়ার মৃত্যু ও তিন পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ

লেখক : ইফতেখার হোসাইন, জনসংযোগ কর্মকর্তা (নোবিপ্রবি) :

মেধাবী শব্দটির বহুমাত্রিক ব্যবহার আজকাল ঢের বেড়েছে। যার দরুণ এর কদরও কিছুটা কমেছে। বলা হয়ে থাকে, দামি কথা পাঁচ মুখে ফিরে কিছুটা গুরুত্ব হারায়। কিন্তু ফওজিয়ার ক্ষেত্রে মেধাবী এ শব্দটির প্রায়োগিক দিক সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। ফওজিয়া ছিলো একজন জাত মেধাবী শিক্ষার্থী, যে স্নাতকে জিপিএ-৪ এর মধ্যে ৩.৯৬ পেয়ে প্রথম হয়। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) ফার্মেসি বিভাগের ইতিহাসে গত ১২ বছরের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ নম্বর।

এমন ঈর্ষনীয় সাফল্য রয়েছে তার মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক ফলাফলেও। উভয় পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছে সে। এরকম মেধাবী ও উচ্চ রেজাল্টধারীরাই পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হন। আর কিছুদিন পরে ফওজিয়াই হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতো। মাত্র চারদিন আগে সে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের নিকট হতে সেরা শিক্ষার্থীর ক্রেস্ট উপহার নেয়। একই বিভাগের প্রভাষক মনির হোসেনের সঙ্গে বাগদানও সম্পন্ন ছিলো ফওজিয়ার। আগামী জানুয়ারীতেই এ দম্পতির বিয়ে অনুষ্ঠানের কথা। তিনটি পরিবারের একটি সূত্রে আবদ্ধ হবার পালা। কিন্তু একটিমাত্র অনাকাঙ্খিত দুর্ঘটনা তাদের সব কেড়ে নিলো। ভেঙ্গে দিলো সমস্ত স্বপ্ন আর স্বাদ। হরণ করলো তিনটি পরিবারে সুখ আর আনন্দের সম্মীলন।

নিন্মমধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে ফওজিয়ার বাড়ি বিশ্ববিদ্যালয়ের অদূরে পশ্চিম শাহপুর গ্রামে। বাবা স্থানীয় কন্ট্রাক্টর, মা ঘরকন্যা করেন। তিন ভাইয়ের মাঝে একমাত্র বোন ফওজিয়া যেমন ছিলেন, মেধাবী, সুশ্রী তেমনি বুদ্ধিমতি। তার জন্মের পর বাবা আদর করে নাম রেখেছেন সিলভি। আর মা রাখলেন ফওজিয়া। পুরো নাম ফওজিয়া মোসলেম সিলভি (২১)। সিলভিকে তার বাবা পরম স্নেহে বুকে নিয়ে বলতো, মা’ তোমাকে আমি বুকের মধ্যমণি করে ধরে রাখতে চাই। কিন্তু আসলেই কি বাবা তার আদরে আহ্লাদ, কলিজার টান সিলভিকে ধরে রাখতে পেরেছেন।

একজন নিন্মমধ্যবিত্ত বাবা কি তার মেয়েকে নিয়ে দেখা স্বপ্নের স্বাদ পূরণ করতে পেরেছেন, পারেননি। কিংবা মেয়ে কি পেরেছে তার সহজ-সরল বাবার হৃদয়ে মাথা গুঁজে থাকতে। অথবা ফওজিয়া কি পেরেছে নিজের স্বপ্নের সমান বড় হয়ে উঠতে, পারেনি। কারণ আমাদের চারপাশেই রয়েছে আকস্মাৎ জীবন কেড়ে নেয়ার যাবতীয় আয়োজন। ফলে ফওজিয়াদের মতো মেয়েদের স্বপ্নপূরণের আগেই অনিচ্ছাকৃত পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করতে হয়।

গত ১৯ নভেম্বর রোববার দুপুরে প্রতিদিনের মতো ফওজিয়া ঘর থেকে বেরিয়েছিলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস ধরতে। নির্ধারিত বাস মিস করায় অগত্যা উঠে পড়েছিল ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায়, আর এটাই যে তার জন্য কাল হবে তা কি জানতো সে। অটোতে প্রথমে বসেছিলো বামপাশে, কিন্তু ডানপাশে বসা ফক্সের রোগী অন্য এক মেয়ের রোদে বসতে কষ্ট হচ্ছিল বিধায় সিট ইন্টার চেঞ্জ করে ডানপাশে এসে বসে। এখানেই মেলে ফওজিয়ার ব্যক্তিগত মানবিকতার পরিচয়। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস। কিছুদূর চলার পর অটোরিকশাটি ঠক্কর নামক জায়গায় এসে হার্ডব্রেক করে। পরক্ষণেই ফওজিয়া রাস্তার মাঝখানে ছিটকে পড়ে।

আর বিপরীতিদিক থেকে আসা পিকআপ ভ্যান তাকে চাপা দেয়। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে ফওজিয়া। তাই সেদিনের সে ক্লাস আর তার ধরা হলো না। অধরা থেকে গেলো তার নিজের এবং পরিবারের স্বপ্ন। হবু বর মনির হোসেনের ভালোবাসারও নিদারুণ মৃত্যু ঘটেছিল সেদিন। পরিবার, আত্মীয়জন, শিক্ষক, প্রিয় সহপাঠী কারো ভালোবাসাই সেদিন তাকে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফেরাতে পারেনি। তার এমন মৃত্যুতে গোটা ক্যাম্পাসে ও নোয়াখালীতে শোকের ছায়া নেমে আসে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. এম অহিদুজ্জামান সঙ্গে সঙ্গেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন ও নিহতের বাড়ি যান। তিনি রিজেন্ট বোর্ডের মাধ্যমে ফওজিয়ার পরিবারের জন্য তিন লাখ টাকার আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করেন। এছাড়া স্থানীয় সাংসদ ফওজিয়ার পরিবারের জন্য একটি ঘর নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন।

পরের দিনগুলোতে ‘নিরাপদ সড়কের নিশ্চয়তা ও ঘাতক ভ্যানচালকের গ্রেপ্তারের দাবিতে ক্যাম্পাসে ও সোনাপুরে মানববন্ধন করা হয়। মানবন্ধনে বক্তারা সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাংসদ একরামুল করিম চৌধুরিসহ প্রশাসনকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ হাজার শিক্ষার্থী এবং শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দের যাতায়াতের একমাত্র সড়কটির প্রকল্পের কাজ দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

প্রসঙ্গত, ফওজিয়ার মৃত্যুর মাত্র দিন দশকের ব্যবধানে গত ৩০ নভেম্বর জেলা শহর মাইজদীতে পিকআপভ্যান ও অটোরিকশার সংঘর্ষে জান্নাত আহম্মেদ আনিসা (১৭) নামে মহিলা কলেজের আরেক ছাত্রী নিহত হয়। কিন্তু আজ পর্যন্ত এসব ঘটনায় দোষীদের বিচারের আওতায় আনা যায়নি। তাই দুর্ঘটনা যেন থামছেই না। তবে একটি মৃত্যু যে নিহতের গোটা পরিবারকে সর্বশান্ত করে দিতে পারে তা কেবল ভুক্তভোগীই পরিবারগুলোই জানে। আমাদের শিক্ষার্থী ফওজিয়ার জীবনে ছোট্ট একটি স্বপ্ন ছিলে শিক্ষকতা করবার। তার বাবারও শখ ফওজিয়া জাতিগঠনে শিক্ষকতার মতো মহান পেশায় ব্রতী হবে। যদিও মেয়েকে পড়ানোর শিক্ষা ব্যয় বহনে তার পর্যাপ্ত সামর্থ ছিলো না। ফওজিয়া তাই নিজের খরচেই এতদিন পড়াশোনা চালিয়ে আসছিলো। দুই, একটা টিউশনি করতো সে। আর তাই দিয়ে নিজের পাঠ ব্যয় চালিয়ে নিতো।

এমন পরিশ্রমী মেয়ের মৃত্যু সংবাদ যখন তার বাবা-মা পেলেন, তখন তাদের মনের অবস্থা কেমন হয়েছিল? পৃথিবীর আর দ্বিতীয় কোনো বাবা-মা সেটা কোনোদিন বুঝতে পারবে না। ফওজিয়ার এমন করুণ মৃত্যুতে তার বাবার মনের ভেতর দিয়ে কী আর্তনাদ বয়ে গেছে, মায়ের বুকের ভেতর দিয়ে তখন কেমন দুঃখ বন্যা বয়েছিল? এ হতভাগ্য দম্পতির সমস্ত সত্ত্বা জুড়ে এখন কী অসহ্য অমেয় বেদনার পাহাড় চেপে বসে আছে! আমরা তা কল্পনাও করতে পারছি না। কিংবা ফওজিয়ার ছোট ভাইদের বোন হারানোর বেদনায় অঝোর কান্নার এই চাপ কি আমার নিতে পারছি। তাদের কী প্রাণবন্ত হাস্যজ্জ্বল একটা বোন ছিল। কিন্তু সে বোনটি আজ বড্ড একা শুয়ে আছে অন্ধকার কবরে। আর চাঁদের আলোয় কবরের কুয়াশামাখা ঘাসে ঝিকমিক করছে তার প্রাণোচ্ছ্বল অবিরাম সেই হাসি।

এসব নিয়ে ফওজিয়ার বন্ধুরা ফেসবুকে এখন শোকগাঁথা লিখছে। তার সহপাঠীরা লিখছে- ফওজিয়া সবার সঙ্গে মিশতো, গল্প আড্ডা আর খুনসুটি পছন্দ করতো। তার করা হ্যান্ড নোট এখনো শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় পাস করার একমাত্র অবলম্বন..ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু ফওজিয়া আর কোনোদিন ফেসবুকে বন্ধুদের এসব লেখার উত্তর দিতে পারবে না। নিজের ওয়ালেও আর লিখবে না সে। এমন সব স্মৃতি আর নস্টালজিয়ায় যেন আর পুড়তে না হয়, তাই ফওজিয়ার বাগদত্তা মনির হোসেনও চাকরি ছেড়ে চলে যাচ্ছেন অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে। তবে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ আর দ্রোহের অঙ্গীকার নিয়ে ফওজিয়ার ঘাতকদের গ্রেপ্তার চায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

এ ভয়ানক দুর্ঘটনায় জড়িতদের শাস্তির দাবিতে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সব দল আর মতের লোকেরাও আজ উচ্চকণ্ঠ ও একাত্ম। ফওজিয়ার মৃত্যুতে দোষীদের গ্রেপ্তারের আর প্রতিবাদের মিছিল আরো বড় হোক। এ প্রতিবাদ থেকে প্রগতি ছড়িয়ে পড়ুক। প্রতিবাদের আগুন আমাদের চেতনায় মশাল হয়ে জ্বলুক। আর রাষ্ট্র তার দায়িত্ব পালনে যেন বিন্দুমাত্র গড়িমসি না করে। ড্রাইভার থেকে শুরু করে প্রত্যেক পেশাদার ব্যক্তিও যেন নিজেকে শুদ্ধ করতে ব্রতী হয়। গোটা রাষ্ট্রযন্ত্র যেন সড়কে যাত্রীদের নিরাপত্তা বিধানে তৎপর হয়। প্রতিটি সড়ক হয় যেন শান্তির, সড়ক যেন মৃত্যুর মিছিলে পরিণত না হয়।

ইফতেখার হোসাইন, জনসংযোগ কর্মকর্তা (নোবিপ্রবি)

     এই বিভাগের আরও সংবাদ

আর্কাইভ

এপ্রিল ২০২৬
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
« মার্চ    
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০