নিজস্ব প্রতিবেদক :
লক্ষ্মীপুর-৩ (সদর) আসনে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আ.লীগের অন্যতম মনোনয়ন প্রত্যাশী সজিব গ্রুপের চেয়ারম্যান শিল্পপতি এম এ হাসেম। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে এ আসনে নৌকা প্রতীকে মহাজোটের প্রার্থী ছিলেন তিনি। নির্বাচনে জয়ের সম্ভাবনা থাকলেও ২৭ হাজার ভোটে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানির কাছে পরাজিত হন। ভোটে হেরে গিয়ে নির্বাচনী এলাকার নেতা-কর্মী ও জনগণের সাথে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখেন তিনি। দলীয় কর্মকান্ডে তো নয়ই ঈদে, চাঁদে বা পূজা পার্বনেও তিনি নির্বাচনী এলাকায় আসেন নি। এতে দলের অভ্যন্তরে নেতা-কর্মীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।
সরেজমিনে লক্ষ্মীপুর-৩ আসনের দলের বিভিন্ন ইউনিয়ন, ওয়ার্ড ও তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের সাথে আলাপকালে এসব ক্ষোভের কথা জানা গেছে। নেতা-কর্মীদের অভিযোগ, নির্বাচনে পরাজিত হয়ে তিনি ব্যক্তিগতভাবে বা দলীয়ভাবেও কারো সাথে যোগাযোগ রাখেন নি। কারো সুখ-দুঃখের খবর নেন নি। তারা বলেন, বিগত ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর বিভিন্ন সময়ে ঢাকা গিয়েও এম এ হাসেমের সাথে তার অফিসে দেখা করা সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় আগামী সংসদ নির্বাচনে দলের প্রতীক নিয়ে নির্বাচনী মাঠে এলে দলের নেতা-কর্মীদের তোপের মুখে পড়তে পারেন তিনি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এলাকায় দলীয় নেতা-কর্মীদের সাথে যোগাযোগ না থাকায় সম্প্রতি (২৯ নভেম্বর) চন্দ্রগঞ্জ ইউনিয়ন আ.লীগের সম্মেলনে দলের কাউন্সিলরের তালিকায় এম এ হাসেমের নাম রাখা হয়নি। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে দলের একজন গুরুত্বপুর্ণ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, উনি কীভাবে কাউন্সিলর হবেন। তিনি তো এলাকায় আসেন না, কারো খোঁজখবর রাখেন না। অথচ এম এ হাসেম চন্দ্রগঞ্জ ইউনিয়নের ৪নং পশ্চিম লতিফপুর ওয়ার্ডের ভোটার।
এ ব্যাপারে সদর উপজেলা আ.লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উত্তর জয়পুর ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কাশেম চৌধুরী বলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনে দলের প্রতীক নিয়ে আসার কারণে আমি প্রত্যেকটি ইউনিয়নে জয়লাভের জন্য কাজ করেছি। কিন্তু তিনি ভোটের পর আমাদের কারো সাথে যোগাযোগ রাখেন নি। দল ক্ষমতায় থাকার সুবাধে তিনি ইচ্ছে করলে এলাকার জন্য উন্নয়নমূলক কাজ সরকার থেকে আনতে পারতেন। কিন্তু তিনি (এম এ হাসেম) কিছুই করেন নি। এখন তিনি আবার নৌকা প্রতীকের এমপি নমিনেশন নিয়ে আসলে তো হবেনা। জনবিচ্ছিন্ন এবং কর্মী বিচ্ছিন্ন হয়ে শুধু নৌকা প্রতীকের প্রার্থী হলেই জয়লাভ করা অত সহজ নয় বলে মন্তব্য করেন আবুল কাশেম চৌধুরী।
জেলা আ.লীগের সহ-প্রচার সম্পাদক মুনছুর আহম্মেদ বলেন, এম এ হাসেম সাহেব দীর্ঘদিন এলাকার সাথে যোগাযোগ না রাখায় কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ আছে। এখন তিনি আবারও মনোনয়ন নিয়ে আসলে তাঁর পক্ষে কর্মীদের মাঠে নামানো খুব কঠিন হবে।
দিঘলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও আ.লীগের অন্যতম নেতা শেখ মজিবুর রহমান বলেন, নেতা-কর্মীদের প্রত্যাশা যারা সব সময় নেতা-কর্মী এবং জনগণের পাশে থাকবেন তারাই দলীয় মনোনয়ন পাবেন। তবুও জননেত্রী কাউকে নমিনেশন দিয়ে পাঠালে আমরা তার বাইরে যেতে পারবনা। তবে এম এ হাসেম সাহেব দীর্ঘদিন এলাকার সাথে যোগাযোগ না রাখায় তার ক্ষোভের কথা জানান।
সদর উপজেলা আ.লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সোহরাব হোসেন রুবেল পাটোয়ারী বলেন, বিগত ২০০৮ সালের নির্বাচনে নৌকার বিজয়ের জন্য আমরা জামায়াত-বিএনপির বিরুদ্ধে জীবনবাজি রেখে ভোট করেছি। অনেক হামলা-মামলার শিকার হয়েছি। পার্টি ক্ষমতায় এসেছে ঠিক কিন্তু এম এ হাসেম সাহেব নৌকার একজন প্রার্থী হিসাবে পরবর্তীতে আমাদের আর খোঁজ খবর নেন নি। আগামী নির্বাচনে আমরা চাই এমন একজন প্রার্থী যিনি সুখে-দুখে নেতা-কর্মীদের পাশে থাকবেন। তবুও জননেত্রী শেখ হাসিনা যাকেই মনোনয়ন দিবেন, আমরা তাঁর পক্ষে কাজ করব।
চন্দ্রগঞ্জ ইউনিয়ন আ.লীগের নবনির্বাচিত সভাপতি নুরুল আমিন বলেন, গত মাস ছয়েক আগে আমি দলীয় একটি বিষয়ে পরামর্শ করার জন্য ঢাকায় এম এ হাসেম সাহেবের সাথে দেখা করতে তাঁর অফিসে গিয়েছি। দুইদিন অপেক্ষা করার পর দ্বিতীয় দিন তিনি আমার সামনে দিয়েই অফিসে ঢুকেন। আমি সালাম দিয়েছি কিন্তু তিনি মাথা নেড়ে ভিতরে ঢুকে যান। আমাকে মনে হয় চিনতেও পারেন নি। পরে অনেকবার উনার অফিসের রিসিপশনে বলার পরও ভিতরে ঢোকার অনুমতি পাইনি। এরপর আমি বাধ্য হয়ে দেখা না করেই চলে আসি।
চন্দ্রগঞ্জ থানা কৃষকলীগের সাধারণ সম্পাদক কাউছার আহম্মেদ বলেন, জনবিচ্ছিন্ন-কর্মী বিচ্ছিন্ন কেউ মনোনয়ন পেলে নৌকার বিজয় সম্ভব হবেনা। এম এ হাসেম শহীদ উদ্দীন চৌধুরীর কাছে হেরে গিয়ে এরপর আর এলাকার কারো খোঁজখবর রাখেন নি।
সাধারণ ভোটার অনেকের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বিগত নির্বাচনে মরহুম ইব্রাহীম মিয়া আজিজ কোম্পানী ও তাঁর পরিবারের প্রতি অনুরাগ এবং ভালোবাসা থাকায় তারা এম এ হাসেমকে ভোট দিয়েছেন। যার ফলে তিনি বিএনপি অধ্যুষিত এলাকায় প্রায় ৮২ হাজার ভোট পেয়েছেন।
এর আগেরবার ২০০১ সালের নির্বাচনে মরহুম এ্যাড. কাজী ইকবাল হোসেন নৌকা প্রতীকে এ আসনে ভোট পান ৪২ হাজার। ৫ বছরের ব্যবধানে ২০০৮ সালের নির্বাচনে দ্বিগুণ ভোট পাওয়ার কারণ দুটি। একটি এম এ হাসেমের পারিবারিক ঐতিহ্য এবং বিএনপি-জামায়াতের দুঃশাসন। কিন্তু বিগত নির্বাচনের পর এম এ হাসেম এলাকার জনসাধারণের সাথে তেমন একটা যোগাযোগ না রাখায় আগেরবারের পারিবারিক সেই ইমেজ এখন আর নেই। এতে সাধারণ অনেক ভোটার হতাশা ব্যক্ত করেছেন।