অন্তর্জ্বালা বা পরাজয়ের গ্লানি খুবই কষ্টদায়ক। আমাদের দেশে একটা সংস্কৃতি হলো ভালো করেছে কে আল্লাহ, খারাপ করেছে কে বান্দা। কিন্তু পরাজয় থেকে আমরা শিক্ষা নেওয়ার সংস্কৃতি আজও চালু করতে পারিনি। মূল্যায়ন করতে শিখিনী কেন পরাজয় হলো?
এ বিষয়ে একটা মতামত আছে : মৃত্যুর সাথে লড়াইয়ের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়েছে মৃত্যু পুরুষ এবং সবসময় আক্রমণাত্মক। সে কখনো পরাজিত হলেও রক্ষণাত্মক অবস্থান নেয়না। পরাজয় বা মৃত্যু বেশ সাহসী এবং হিংস্র। তবে কখনো কখনো তাকে ভীরু ও প্রতারক হতেও দেখেছি এবং মানুষ যে মনে করে মৃত্যু অপরাজেয়।
কোনো বীরপুরুষের সাথে লড়াইয়ে, মল্লযুদ্ধে মৃত্যু হেরে গেছে। আহত-রক্তাক্ত হয়ে কুরুক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে গেছে এমন ঘটনা খুব বিরল নয়। কিন্তু মৃত্যু মার খেয়ে, আহত হয়ে একেবারে ধরাশায়ী হয়ে গেছে, আত্মসমর্পণ করেছে বা প্রতিপক্ষের হাতে বন্দী হয়েছে এমনটা কখনো ঘটেনি। এটাই হচ্ছে মৃত্যুর সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক। এর ফলেই মৃত্যু সবসময় জীবনের বিরুদ্ধে জিতে যাচ্ছে।
মৃত্যুর রণকৌশল সত্যিই বিরল। মৃত্যু লড়াই করে সীমাহীন ধৈর্য এবং জয়ের ব্যাপারে তার প্রতিপক্ষ যত পরাক্রমশালীই হোক না কেন সম্পূর্ণ আস্থা নিয়ে। এমনকি সে যখন মাঝে মাঝে হারতে থাকে বা মারাত্মকভাবে আহত হয় তখনো তার সেই আস্থায় বিন্দুমাত্র চির ধরেনা এবং মৃত্যুঞ্জয়ী বিভ্রান্ত বীরদের বিজয় উৎসবের দূরাগত সঙ্গীত-ধ্বনি তার মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারেনা, তার মধ্যে হতাশা জাগায় না বরং সে নতুন উদ্যমে আবার আক্রমণের জন্য প্রস্তুতি নেয়।
যে কোনো যুদ্ধে, সেটা রণাঙ্গন-ই হোক বা ভোট যুদ্ধই হোক তার একটা রণকৌশল থাকে। রণনীতি বা রণকৌশল পাকাপোক্ত না হলে পরাজয় অবসম্ভাবী হিসাবে ধরা দেয়। লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জ বাজার কমিটির শনিবারের নির্বাচনে ভোটারদের কাঙ্খিত ফলাফল হলেও পরাজিতদের অন্তর্জ্বালা প্রকাশ পাচ্ছে তুসের আগুনের মত।
ভোটের তফসিল ঘোষণার পর ভোটের দিন পর্যন্ত কোনো প্রার্থী ভুয়া ভোটারের বিষয়ে লিখিত কোনো অভিযোগ বা আপত্তি জানায়নি। তবে আমার লেখনিতে এবং দুই একটি মিডিয়ায় ভুয়া ভোটার বা ভূতুড়ে ভোটার সম্পর্কে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। তখনও এসব সংবাদের ভিত্তিতে কোনো প্রার্থী অভিযোগ তোলেন নি। তারা কেন অভিযোগ তোলেন নি, তা অবশ্য জানা যায়নি। তবে ভোটে পরাজিত হয়ে এখন ওইসব প্রার্থীদের কতিপয় সমর্থক ভুয়া ভোটারের প্রসঙ্গটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করছেন। আর এ সময় অভিযোগ তোলার মানে হচ্ছে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকা দেওয়া এবং অন্যের দোষ-ক্রুটি খুঁজে বেড়ানো।
যেসব প্রার্থীরা জিতেছেন আমার মূল্যায়নে তার প্রথম কারণ হচ্ছে পরাজিত প্রার্থীদের সমর্থকরা প্রতিপক্ষ প্রার্থীকে ঘায়েল করতে অতিরঞ্জিত মিথ্যা প্রচারণা, দ্বিতীয়ত হচ্ছে কাল্পনিক কথামালা সমৃদ্ধ প্রপাগান্ডা এবং আত্ম অহমিকা। তারা এতটাই আস্থাশীল ছিলেন যে তাদের প্রপাগান্ডায় প্রতিপক্ষ প্রার্থী ধরাশায়ী হবে। অন্যদিকে প্রতিপক্ষদের তীরন্দাজ ও আক্রমণাত্মক প্রচারণায় বিজয়ী প্রার্থীদের গণসংযোগ বৃদ্ধি পায় এবং জয় নিশ্চিতে এগিয়ে যায়। তবে এতটা অভাবনীয় সাফল্য বা জয় আসবে তা কল্পনাতীত ছিল। জয় নিশ্চিত এটা শতভাগ আস্থায় ছিল বিজয়ীরা কিন্তু ব্যবধান বা একেবারে আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবে তা অনুমান ছিলনা।
যাই হোক পরাজয় থেকে শিক্ষা নিয়ে এবং ভবিষ্যতে মানুষের আস্থা অর্জনে কাজ করলে আজকে যারা পরাজিত হয়েছেন, একদিন তারা হয়তো আরো বড় বিজয় লাভ করবেন। পাশাপাশি আজকের বিজয়ীরা অহংকারের চাদর গায়ে না মেখে ভোটারদের কাঙ্খিত প্রত্যাশা পূরণে কাজ করবে এমনটাই প্রত্যাশা করছি। সবাই ভালো থাকবেন।
লেখক : মো. আলী হোসেন, সাংবাদিক ও সম্পাদক-আকাশবার্তাবিডি ডটকম।