শনিবার ২৮শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ইং ১৬ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ:
লক্ষ্মীপুরে আগুনে পুড়ে ৯ দোকান ছাই, ৭৫ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি মানবিক ও নিরাপদ বাংলাদেশ গঠনে সবার সহযোগিতা চাই নবনির্বাচিত ২৯৭ সংসদ সদস্যের গেজেট প্রকাশ নির্বাচনে ভোটের বক্স নিয়ে যাবে নদীর দিকে, আশঙ্কা জেএসডি নেতার ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির মহিমান্বিত রজনী-শবে বরাত জামায়াত ক্ষমতায় এলে দেশ পাকিস্তান হয়ে যাবে : ফজলুর রহমান লক্ষ্মীপুরে ৬ সিলসহ ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার : বিএনপি-জামায়াত প্রার্থীর পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন যাদের জন্য দেশে আসতে পেরেছেন, তারা জুলাইয়ের অবদান অস্বীকার করছেন : ডা. শফিকুর রহমান লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জে নিখোঁজের ৭দিন পর কলেজ ছাত্রের লাশ উদ্ধার লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জে যৌথবাহিনীর অভিযানে অস্ত্রসহ শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘চিতা’ গ্রেপ্তার

রক্ষকই যখন ভক্ষক

* ৩২ জেলার সীমান্তের ৫১ পয়েন্ট দিয়ে আসছে মাদক, * বিত্তশালী থেকে নারী, * শিশু ও কিশোররাও জড়িত ব্যবসায়, * ৭০ থেকে ৮০ লাখ জনগণ মাদকের সঙ্গে জড়িত, * মাদকাসক্ত ৮৪ শতাংশ পুরুষ ১৬ শতাংশ নারী


নিজস্ব প্রতিবেদক :

গ্রাম, মহল্লা থেকে শুরু করে শহরের অলি-গলিতে হাত বাড়ালেই মিলছে সর্বনাশা ইয়াবা, ফেনসিডিল ও সিরাপ। শুধু সেবনই নয়, সমাজের বিত্তশালী থেকে শুরু করে নারী, শিশু-কিশোররাও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সখ্য এবং মাদক সেবন ও ব্যবসায় বাহিনীটির কতিপয় সদস্যের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে জড়িত থাকার কারণে মহামারি আকার ধারণ করছে এ ব্যবসা। জানা যায়, পূর্বে যারা ফেনসিডিলে আসক্ত ছিলো, বর্তমানে তারা ইয়াবায় আসক্ত। এদের মধ্যে ৮৪ শতাংশ পুরুষ ও ১৬ শতাংশ নারী। মাদক নিয়ন্ত্রণের বিপরীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্য, মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিরা মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা করে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। সে কারণেই মাদকসেবী ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় অসাধু সদস্যদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে বলেও মনে করেন তারা।

সম্প্রতি মালখানায় থাকা মাদক নিয়ে গোপনে ব্যবসা করার অভিযোগে কুমিল্লার কোতোয়ালি মডেল থানার দুই এসআইসহ পাঁচজনকে শাস্তির আওতায় এনেছে জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মালখানার দায়িত্বে থাকা এসআই আহসান হাবীব, থানার অপারেশন অফিসার এসআই তপন বকশি ও কনস্টেবল তানভীরকে শাস্তিস্বরুপ জেলা পুলিশ লাইনে স্থানান্তর করা হয়েছে। এদিকে, রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা সূত্রে জানা যায়, কাজলা এলাকায় ভাঙ্গাবাড়ী নামের একটি বাড়িতে প্রায় প্রতিদিনই যাত্রাবাড়ী থানার এক কনস্টেবল এসে ইয়াবা সেবন করেন এবং সেখান থেকে ইয়াবার বড় বড় চালান বিক্রিও করেন। তার সাথে স্থানীয় রাজনৈতিক দলের কয়েকজন নেতাকর্মীও রয়েছেন।

সম্প্রতি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নাজমুল কবিরকে ঘুষের দুই লাখ টাকাসহ গ্রেপ্তার করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বিপুল মাদকসহ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ভৈরব সার্কেলের পরিদর্শক কামনাশীষ সরকারকে আটক করে পুলিশ। অন্যদিকে কুমিল্লা-ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটি কাগজের টোকেনই নিরাপত্তা দেয় মাদক বহনকারীদের। সাংকেতিক চিহ্নসংবলিত এই কাগজের ‘টোকেন’ মাদক পাচারকারীদের রক্ষাকবচ। টোকেন সঙ্গে থাকলে রাস্তায় আর পুলিশি হয়রানির ঝুঁকি থাকে না। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশের ৩২ জেলার সীমান্তের ৫১ পয়েন্ট দিয়ে আনা হচ্ছে হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য।

এসব মাদকদ্রব্য কঠিন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পৌঁছে যাচ্ছে গ্রাম থেকে শহরে। স্থানীয় লোকজন বলছেন, গুটি কয়েক মানুষের অর্থের লিপ্সাই পুরো এলাকার তরুণদের মাদকাসক্ত করে তুলছে। যুবকদের পাশাপাশি স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীরাও সেবন করছে মাদক। তাদের অভিযোগ– পুলিশ মাঝেমধ্যে মাদকবিরোধী অভিযান চালায়। কিছু লোককে আটক করে। কিন্তু কয়েক দিন পর তারা ছাড়া পেয়ে আবার সেই ব্যবসা শুরু করে।

মাদক নিয়ন্ত্রণের অধিদপ্তরের সূত্র মতে, দেশে ইয়াবা আসক্তের সংখ্যা বাড়ছে। ২০১৫ সালের চেয়ে এদের সংখ্যা বেড়ে দেড় গুণ হয়েছে। মাদকসেবীদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ইয়াবা সেবন করে। এরা বেশি বিপজ্জনক এবং বয়সের দিক থেকে প্রধানত তরুণ-তরুণী। এদের কারণে ঘরে-বাইরে, সমাজ-সংসারে সর্বত্র অশান্তি ও অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে, ওরা প্রতিদিন নেশা করার টাকা না পেলে মা-বাবাকে মারধর এবং ঘরের জিনিসপত্র ভাঙচুর করে।

গত কয়েক দশকে এ দেশে মাদক সেবনের প্রবণতা ও এর প্রভাবে নানা ধরনের অপরাধের ঘটনা অনেক বেড়েছে। পাশাপাশি বৃদ্ধি পেয়েছে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকের অনুপ্রবেশ ও অবৈধ ব্যবসায়। এদিকে, মাদকের মরণনেশায় তরুণসমাজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে। যাদের জাতির ভবিষ্যৎ কর্ণধার হওয়ার কথা, তাদের এহেন পরিণতি দেখে বোঝা যায়, আগামীদিনে সমাজের অবস্থা কী দাঁড়াবে।

মাদকসেবীদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না– এমন হতাশা প্রকাশ করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণ নয়, দরকার নির্মূল। নির্মূলের জন্য প্রয়োজন ‘শুট অন সাইট’ (দেখামাত্র গুলি করা)। উন্নত বিশ্বে এটি আছে। মন্ত্রী বলেন, ‘শুট অন সাইট’ ৬৪ জেলা বা ৫০৮টি উপজেলায় করতে হবে না। ১০টিতে করলেই মাদক নির্মূল হয়ে যাবে। আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হোক। কিন্তু সব দল মিলে সিদ্ধান্ত দিতে হবে যে, তুমি এটা করো। এটা এক নম্বর সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে।

পুলিশি অভিযানের পরও কীভাবে মাদক বিক্রি চলছে, এ নিয়ে কথা হয় একজন মাদক বিক্রেতার সঙ্গে। তিনি বলেন, অবৈধ ব্যবসা সব সময় পুলিশকে জানিয়ে করতে হয়। ধরেন, আমরা মোবাইলে কাস্টমারকে খবর দিই। কাস্টমার নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট জায়গা থেকে জিনিস নিয়ে যায়। ওই জায়গাটা যারা কিনবে তারাও চেনে, পুলিশও চেনে। পুলিশ চিনলে কীভাবে এটা করেন, এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পুলিশের ইনফরমারের (আসলে ঘুষের দালাল) মাধ্যমে টাকার পরিমাণ ঠিক হয়। প্রতি সপ্তাহে ইনফরমার এসে তা নিয়ে যায়। মাদকবিরোধী অভিযানের আগে দারোগারা খবরটা জানিয়ে দেন। তখন তারা সড়ে পড়েন। দেখা গেছে, মাদকে জড়িত থাকার অভিযোগ ৬৭ জন পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

পুলিশের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র উপ-মহাপরিদর্শক (গণমাধ্যম) আবদুল আলিম মাহমুদ বলেন, বাহিনীর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসা মাত্রই আমরা কিন্তু তাদের শাস্তি নিশ্চিত করছি। কারো কারো ক্ষেত্রে বিভাগীয় মামলা হচ্ছে, আবার কারো ক্ষেত্রে ফৌজদারি মামলাও দেয়া হচ্ছে। আমরা শাস্তির মাধ্যমে তাদের বোঝাতে চাই, অপরাধ করলে পার পাওয়া যাবে না। কে না জানে, মাদক আমাদের জন্য একটি জাতীয় সমস্যা হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে বহু আগেই। যারা মাদক উৎপাদন, পাচার ও মাদকের ব্যবসায় জড়িত তারা মানবতাবিরোধী অপরাধী। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, মাদক ও সাম্প্রদায়িকতা একই ধরনের ভয়ানক আসক্তি। এ দুটো সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। যারা মাদক সেবন ও সাম্প্রদায়িকতায় জড়িয়ে পড়ে তারা অল্প সময়ের মধ্যেই কা-জ্ঞানহীন প্রাণীতে পরিণত হয়। এরা জড়িয়ে যায় নানা ধরনের অপরাধে, ফলে সমাজে সৃষ্টি হয় বিশৃঙ্খলা।

২০১৭ সালের নভেম্বর পর্যন্ত দেশে ৯৭ হাজার ৮৮৭টি মাদক মামলা হয়েছে। এতে আসামি হয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ৪০ জন। এ বিশালসংখ্যক আসামির সিংহভাগই হাতেনাতে ধরাপড়া মাদকাসক্ত, বিক্রেতা ও চোরাকারবারি। আটকের সঙ্গে কোটি কোটি টাকার নিষিদ্ধ মাদকদ্রব্য জব্দ হলেও থামছে না অবাধ প্রবাহ।

এ ব্যাপারে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক সঞ্জয় কুমার চৌধুরী বলেন, মাদকের বিস্তার ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বাড়ছে খুব দ্রুত হারে। দেশের ১৭ থেকে ১৮ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে এখন ৭০ থেকে ৮০ লাখই বিভিন্ন মাদকে আসক্ত। মাদকে প্রভাবিত ও ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যা বহুগুণ বেশি। তাছাড়া অপরাধের একটা বড় অংশই সংঘটিত হচ্ছে মাদকাসক্তদের দ্বারা। মাদকের পেছনে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণও বিপুল। লাগামহীন বিস্তার এখনই থামানো না গেলে চরম মূল্য দিতে হবে।

সূ্ত্র : এএইচ/আমার সংবাদ।

     এই বিভাগের আরও সংবাদ

আর্কাইভ

ফেব্রুয়ারি ২০২৬
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
« জানুয়ারি    
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮