,

ধ্বংসাত্নক সমালোচনা নয়, গঠনমূলক সমালোচনা করুন

বিশেষ প্রতিবেদন :

মানুষের জীবন হাজারো কাজের সমষ্টি দ্বারা তৈরি। এই বিশাল কর্মযজ্ঞে অংশ নিতে গিয়ে আমাদের প্রত্যেককেই অজস্র বাধা-বিপত্তি , সমালোচনা, উপহাস কিংবা অপমানজনক কথাবার্তা শুনতে হয়। তবে যে কারো সমালোচনা করার পূর্বে তার কাজটুকু জেনে নেয়া, তার অবস্থানটুকু তার জায়গায় দাঁড়িয়ে উপলব্ধি করা অতি জরুরি। এজন্য কারো সমালোচনা করা যথাযথ কিংবা যুক্তিযুক্ত কিনা সেদিকে খেয়াল রাখা প্রয়োজন।

এর একমাত্র উপায় হচ্ছে ধবংসাত্নক সমালোচনার চেয়ে গঠনমূলক সমালোচনায় অধিক মনোনিবেশ করা। আমাদের কর্মক্ষেত্রে আমরা যখন কোন কাজে ভুল করে বসি, তখন আমাদের আশেপাশের অনেকেই আমাদের বিভিন্নভাবে পরামর্শ দেয়,সমাধান দেয় কিংবা সমালোচনা করে। তবে যাই প্রতিক্রিয়া দেখাক না কেন তা সঠিকভাবে হচ্ছে কিনা, সেদিকটায়-ও লক্ষ রাখা উচিত। কারো কোন কাজের প্রতিক্রিয়া দেখাতে গিয়ে আমরা তার কাজকে কিংবা তার ব্যক্তিমর্যাদাকে অপমান করছি কিনা সেটাও খেয়াল করতে হবে।

ধ্বংসাত্নক সমালোচনা ও গঠনমূলক সমালোচনা

প্রাথমিকভাবে জেনে নেয়া যাক ধ্বংসাত্নক সমালোচনা ও গঠনমূলক সমালোচনা মূলত কি। গঠনমূলক সমালোচনা বলতে বোঝায় কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কোন ভুলভ্রান্তিগুলোকে তুলে ধরে তা শুধরিয়ে নেয়ার জন্য তাকে আহ্বান জানানো যেন সে সেই ভুল ঠিক করে নিয়ে পরবর্তীতে তার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌছুতে পারে। আর ধ্বংসাত্নক সমালোচনা বলতে বোঝায় অন্যের ব্যর্থতা নিয়ে উপহাস করে তার কার্যক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে যা সেই ব্যক্তির সামনে এগিয়ে চলার পথে এক বিশাল অন্তরায় সৃষ্টি করা।

ধ্বংসাত্নক সমালোচনা ও গঠনমূলক সমালোচনা এর মধ্যকার পার্থক্য

আপাতপক্ষে দুধরনের সমালোচনার মধ্যে পার্থ্যক্য নিরুপণ করা খুব-ই গুরুত্বপূর্ণ। গঠনমূলক সমালোচনা যেখানে আমাদের কাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে, ধ্বংসাত্নক সমালোচনা অন্যদিকে আমাদের মনে নেতিবাচক ধ্যান-ধারণার অবতারণা ঘটায়। আমাদের যেকোন কাজের যথাযথ মূল্যায়ন গঠনমূলক সমালোচনা দ্বারা সম্ভব যা ধ্বংসাত্নক সমালোচনায় অনুপস্থিত।

গঠনমূলক সমালোচনা যেখানে ভবিষ্যতে উন্নতি আনতে সঠিক উপায়গুলো আমাদের সামনে তুলে ধরে, ধ্বংসাত্নক সমালোচনা সেখানে আমাদের বর্তমান ব্যর্থতার উপর আলোকপাত করে যা আমাদের মনোবলে আঘাত হানে, আত্নবিশ্বাসের জায়গা নড়বড়ে করে তোলে। গঠনমূলক সমালোচনা একদিকে আমাদের উন্নতির পথে ধাবিত করতে অনুপ্রেরণা জোগায়, অন্যদিকে ধ্বংসাত্নক সমালোচনা আমাদের অবনতির দিকটা কটাক্ষ করে যা আমাদের আত্নবিশ্বাসে ভাঙন ধরায়।

সমালোচনাকারী চিনে নেয়া গুরুত্বপূর্ণ কেন

জীবনে কারা আমাদের সফলতা দেখতে চায়, আমাদের মঙ্গল কামনা করে কিংবা কারা আমাদের সদা শুভকামনা জানায় তা সমালোচনার ধরন দেখেই আঁচ করে নেয়া যায়। একজন শুভাকাঙ্ক্ষী কখনোই কারো কাজের ভুলের জন্য তাকে কটাক্ষ করবে না, তাকে নিয়ে হাসিঠাট্টায় মেতে উঠবে না বরং তার কাজের ভুল কাটিয়ে তা আরো সুন্দরভাবে সম্পন্ন করার পরামর্শ দেবে। তাই নিজের জীবনের শুভাকাঙ্ক্ষী চিনে নিতে এই দুই ধরনের সমালোচনাকারীদের মধ্যকার পার্থক্য বুঝে নেয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের আশেপাশে সবসময়-ই এমন কিছু মানুষ এর আনাগোনা থাকে যারা আমাদের যেকোন কাজে ভুল ধরতে পটু। অতপর সেই ভুলকে নিয়ে অহেতুক কাঁটা- ছেঁড়া করে আমাদের আত্নবিশ্বাসকে একদম তলানিতে নামিয়ে আনতে বাধ্য করে। এই ধরনের মানুষেরা ধ্বংসাত্নক সমালোচনায় বিশ্বাসী । অন্যদিকে আমাদের সকলের-ই কোন না কোন শুভাকাঙ্ক্ষী থাকে যাদের কোন মতামত কিংবা ভুল ধরিয়ে দেয়া আমাদের আত্নবিশ্বাসে চিড় না ধরিয়ে বরং আমাদের কাজে আরো উদ্দীপনা এনে দেয়। তারা হলেন গঠনমূলক সমালোচনাকারী।

গঠনমূলক সমালোচনা করার উপায়

আমাদের আশেপাশে কেউ যখন কোন কাজে ভুল করে, কোন সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করে তখন আমরা তাকে গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে তার ভুল সংশোধন এর জন্য ব্যবস্থা নিতে পারি। সঠিক সময় ও সুযোগ বেছে নেওয়া কারো গঠনমূলক সমালোচনা করলে শুরুতেই খেয়াল রাখতে হবে তা গ্রহণ করার জন্য সে মানসিকভাবে প্রস্তুত কিনা। কাজে বাধা-বিপত্তি কিংবা ভুল্ভ্রান্তি থাকার জন্য তার মনের অবস্থা তখন সমালোচনা গ্রহণ করার মত অবস্থায় নাও থাকতে পারে। ধীরেসুস্থে সময় গেলে পরে সময় সুযোগ করে তার সাথে করণীয়গুলো সম্পর্কে আলোচনা করা যায়।

ভুক্তভোগীর মনের অবস্থা বোঝা একজন ব্যক্তি যখন তার কাজে ব্যর্থ হন, স্বাভাবিকভাবেই তার মনের মধ্যে অশান্তির বাতাস বয়ে যায়। সেই অবস্থায় তার কাজের ভুল ধরিয়ে দেয়া নিতান্তই অনুচিত। তাই তার মনের অবস্থা সম্পর্কে অবগত হয়ে তবেই তার দিকে এগোতে হবে। তার সাথে তার ভুল নিয়ে কথা বললে সে রেগে যাবে কিনা, তার মেজাজ খারাপ হবে কিনা এই ব্যাপারগুলো মাথায় রাখতে হবে।

পারস্পরিক সম্পর্কের ধরন মানুষ যেকারো থেকেই সমালোচনা পেতে মোটেই পছন্দ করে না তা যে ধরনের সমালোচনা-ই হোক। তাই ভুক্তভোগীর সাথে আপনার সম্পর্ক কেমন এই ব্যাপারটা ভেবে দেখতে হবে। যদি আপনাদের মধ্যে এমন সম্পর্ক থাকে যে উনি আপনার গঠনমূলক সমালোচনা সাদরে গ্রহণ করবেন তবে এক্ষেত্রে আপনি অগ্রসর হতেই পারেন অন্যথায় আপনাদের সম্পর্কের ভবিষ্যত অনিশ্চিত হতে পারে বা আগের চেয়ে খারাপও হতে পারে।

যথোপযুক্ত সমাধানের প্রস্তাব কারো ভুল ধরিয়ে দেয়ার পর সেটা নিয়ে একটি কার্যকরী সমাধানে আসাও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কাজের মূল্যায়ন করার পর নিজের যাবতীয় পরামর্শ কিংবা সমাধানের পন্থাগুলো নিয়ে আলোচনা করতে হবে যেন ভবিষ্যতে তার পুনরাবৃত্তি না ঘটে। তার করণীয়গুলো সম্পর্কে তাকে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দিতে হবে যা ভবিষ্যতে কাজে লাগবে। নিজের অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রগুলো একসাথে আলোচনা করে সম্ভাব্য উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে।

অনুপ্রেরণা জোগানো যেকারো কাজে ব্যর্থ হলে ভুক্তভোগীর মনের মধ্যে রাজ্যের হতাশা কাজ করে। সেই কাজ পুনরায় শুরু করতে মন থেকে আর আকাঙ্ক্ষা কাজ করে না। এক অজানা আশংকায় মন দোদুল্যমান থাকে। তাই যেকারো ভুল্ভ্রান্তি নিয়ে কথা বলতে গেলে অবশ্যই তাকে ভবিষ্যতের জন্য অনুপ্রেরণা দিতে হবে। প্রাথমিক পর্যায়ের ব্যর্থতার জন্য কাজের প্রতি যে উৎসাহ হারিয়ে ফেলার আশংকা সৃষ্টি হয় তা পরবর্তীতে মারাত্নক ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। তাই ভুক্তভোগীর কাঁধে হাত রেখে তার হারানো আত্নবিশ্বাস পুনরুদ্ধারে তাকে সৎসাহস দিতে হবে যেন সে নবউদ্যমে কাজ করতে পারে।

প্রত্যাশা ব্যক্ত করা একজন মানুষ যখন পৃথিবীতে জন্ম নেয়, তার পর থেকেই তার জীবনের বিভিন্ন ধাপে তার প্রতি তার আপনজনদের হাজারো আশা- ভরসা কিংবা প্রত্যাশা থাকে। তাই কেউ যখন কোন কাজে ব্যর্থ হবে, তাকে বোঝাতে হবে যে তার নিকট সকলের আশা-প্রত্যাশা অনেক তাই তা পূরণের দায়িত্ব-ও একমাত্র তার-ই। আপনজনদের প্রত্যাশা পূরণের জন্য হলেও নিজের কাজে শতভাগ আত্নপ্রত্যয় ব্যক্ত করতে হবে।

ধ্বংসাত্নক সমালোচনার প্রতিকার

অন্যের বেলায় যেমন গঠনমূলক সমালোচনা যেমন করতে হবে, তেমনি কেউ ধ্বংসাত্নক সমালোচনা করলে এর বিরুদ্ধেও রুখে দাঁড়াতে হবে। সমাজে এমন অনেক মানুষ খুঁজে পাওয়া যায় যারা সর্বদা অন্যকে হেয়প্রতিপন্ন করতে সবসময় ব্যস্ত থাকেন। তাদের কাজ-ই হল অন্যের ব্যাপারে নাক গলানো, অন্যের কাজের তাগিদটুকুকে নষ্ট করে দেয়া।

যেকোন সৃষ্টিশীল উদ্যোগকে স্থবির করে দিতে এরা যথেষ্ট। সমাজে এদের সংখ্যা অনেক। তাই চাইলেও খুব সহজে এদের পুরোপুরিভাবে দমন করা সম্ভব নয়। তবে ইচ্ছে থাকলে এদের প্রতিরোধ করা যায়। ধ্বংসাত্নক সমালোচনাকারীদের কথাবার্তা কিংবা মন্তব্যকে মোটেও পাত্তা দেয়া যাবে না। তাদের মতামতকে অগ্রাহ্য করে পাশ কাটিয়ে যেতে হবে। যেকোন তীর্যক ও আপত্তিকর মন্তব্যের বিপক্ষে প্রতিবাদী হয়ে উঠতে হবে। মুখ বুজে তা সহ্য করে নেয়া নির্বুদ্ধিতা ছাড়া আর কিছু নয়।

সংকীর্ণ মনোভাবাপন্ন এমন মানুষ সমাজে ভদ্রতার মুখোশ পরে চলাচল করে। তাই সময়মত তাদের এই ভদ্রতার মুখোশ উন্মোচন করে দিতে হবে যেন সকলে তাদেরকে পরিহার করে। এই সমাজে নানা রকমের মানুষের বসবাস রয়েছে। গঠনমূলক সমালোচনাকারীর চেয়ে এখানে ধবংসাত্নক সমালোচক সংখ্যাই বেশি। তবে সামাজিক স্থিতিশীলতা ও বৃহত্তর মানবকল্যাণের স্বার্থেই আমাদের ধবংসাত্নক সমালোচনা বর্জন করে গঠনমূলক সমালোচনাকারীদের মতামতকে সাদরে গ্রহণ করে নিজেদের অগ্রযাত্রা প্রবাহমান রাখতে হবে।

(সংগ্রহিত)

     এই বিভাগের আরও সংবাদ

আর্কাইভ

মার্চ ২০২০
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
« ফেব্রুয়ারি    
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০৩১  
}