আকাশবার্তা ডেস্ক :
‘যাত্রী থাকা সত্ত্বেও বাসে লোক ওঠায়নি কন্ডাক্টর। যখন নামার জন্য রেডি হব; হঠাৎ পেছন থেকে ২টা লোক আমাদের দুজনকে হাত দিয়ে মুখ-চোখ চেপে ধরে। জোরে টানা শুরু করল বাসটা, চোখে অন্ধকার দেখছিলাম। আরেকটা লোক আমার পা বাঁধা শুরু করলো। মুখে রুমাল চেপে ধরায় চিৎকারও দিতে পারছিলাম না। ভয়ে আতঙ্কে শরীরের প্রতিটা নার্ভ জমে গিয়েছিল। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে বুঝতে পারলাম আমি একদম গেটের সামনে এসে পড়েছি। নিজের শক্তি দিয়ে লোকটার বুকে আঘাত করি, ছেড়ে দিলে আরেকটা লাথি মারি পেট বরাবর। লোকটা ড্রাইভারের পাশে পড়ে যায়। গেট খুলে বাস থেকে লাফ দিয়ে ছিটকে পড়ি। বাসটা সোজা চলে যায়। বুক ফেটে, রাগে, দুঃখে ভয়ে শুধু চোখ দিয়ে পানি ঝরছে আমাদের। এখনো রাগে-ভয়ে কাঁপছি। কাকে কি বলবো? বলে কী লাভ? কে পাবে তাদের? কার কাছেই বা বিচার চাইব?’ সম্প্রতি ঢাকার একটি চলন্ত বাসে পরিবহণ শ্রমিকদের ধর্ষণের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারা ২ তরুণী নিজেদের ভয়াবহ পরিস্থিতি, শঙ্কা, আত্মরক্ষা ও ক্ষোভের কথা এভাবেই ফেসবুকে তুলে ধরেন।
এ ঘটনার দুদিন বাদেই গত শনিবার দুপুরে বাড্ডায় তুরাগ পরিবহণের একটি বাসে ধর্ষণ চেষ্টার শিকার হন উত্তরা ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসের এক ছাত্রী। ধস্তাধস্তি করে তিনিও বাস থেকে লাফিয়ে আত্মরক্ষা করতে সমর্থ হন। গণপরিবহণে একের পর এক ঘটছে ধর্ষণের ঘটনা। শুধু তা-ই নয়, ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাও বাড়ছে। বিভিন্ন জায়গায় ঘটে যাওয়া ধর্ষণের ঘটনায় জড়িতরা গ্রেপ্তার হচ্ছে, সাজা হচ্ছে, কেউ কেউ বন্দুকযুদ্ধে মারাও যাচ্ছে। কিন্তু বন্ধ হচ্ছে না এ ধরনের বর্বরতা-নিষ্ঠুরতা। সম্প্রতি সন্ধ্যাপূর্ব সময় খোদ রাজধানীতে চলন্ত বাসে ধর্ষণচেষ্টার মতো ঘটনায় আতঙ্ক বিরাজ করছে নারী যাত্রীদের মনে। আতঙ্কিত সকল অভিভাবক। তবে সকলেরতো আর ওই সাহসী ছাত্রীর ন্যায় লম্পটের বুকে লাথি মারার মতো সামর্থ্য নেই। তাদের পরিণতি হয় করুণ। কখনো মৃত্যু।
গত বছরের ৬ ডিসেম্বর মাগুরার রাঘবদাইড় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রী মিনু খাতুন পরীক্ষা শেষে রাস্তার ফুটপাত দিয়ে হেঁটে বাড়ি ফিরছিলেন আপন মনে। পথে চলন্ত ট্রাকের চালক মিনুর চুল ধরে টান দেয়। এতে ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলে তার মৃত্যু হয়। গত ২৫ আগস্ট টাঙ্গাইলের মধুপুরে চলন্ত বাসে ঢাকার আইডিয়াল ‘ল’ কলেজের শিক্ষার্থী রুপা খাতুনকে গণধর্ষণ ও ঘাড় ভেঙে হত্যার ঘটনায় আজো শোকে বিহ্বল সকল বিবেকবান মানুষ। জঘন্যতম এ নিষ্ঠুরতম ঘটনার চলমানবিচারের মধ্যেই একের পর ঘটনায় নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর মাসুদা এম রশীদ চৌধুরী এ ধরনের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, আজ নারীদের কোথাও নিরাপত্তা নেই। কিছু কিছু গণপরিবহণ শ্রমিক যেন মানুষরুপী হায়েনা। তরুণী কিংবা নারীদের কথা বাদই দিলাম। ওই হায়েনা নরপশুদের হাতে নিরাপদ নয় অবুঝ শিশুও। গণপরিবহণ শ্রমিকদের নিয়োগের ক্ষেত্রে নীতিমালা থাকা উচিৎ। বাড়ির ভাড়াটিয়াদের যেভাবে জীবন বৃত্তান্ত বাড়িওয়ালার মাধ্যমে থানাকে অবহিত করা হয়। পরিবহণ শ্রমিকদেরও সেভাবে বাস মালিকদের মাধ্যমে জীবন বৃত্তান্ত সংরক্ষিত করা উচিৎ। কোনোভাবেই বদলি ড্রাইভার কিংবা হেলপার দিয়ে গাড়ি চালানো যাবে না। এজন্য সরকারের পক্ষ থেকে মনিটরিং করা উচিৎ। বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির তথ্য মতে, গত ১৪ মাসে গণপরিবহণে অন্তত ৩২ জন নারী গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণ শেষে হত্যাও করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, এ ধরনের ঘটনা থেকে নিস্তার পেতে হলে প্রথমেই বাস মালিকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। চালক ও হেলপারের বায়োডাটা একাধারে বাস মালিক, বিআরটিএ এবং পুলিশের ট্রাফিক বিভাগে সংরক্ষিত থাকতে হবে। উবারের ন্যায় ডিজিটাল নম্বরের মাধ্যমে গাড়ির অবস্থান সনাক্ত ও গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য সিসিটিভির আওতায় আনতে হবে। ওই সংগঠনের তথ্যমতে, গণপরিবহণে গত ১৪ মাসে ৩২ নারী ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে বাস চালক-হেলপারসহ তাদের সহযোগীরা মিলে ১০টির বেশি গণধর্ষণের ঘটনা ঘটিয়েছে।ধর্ষণের ৮টি ও ৮টি শ্লীলতাহানি সংগঠিত হয়। সংগঠনটির পর্যবেক্ষণ মতে, চলতি বছরের ২ এপ্রিল টাঙ্গাইল জেলার মধুপুরে একটি চলন্ত বাসে এক গার্মেন্টকর্মী গণধর্ষণের শিকার হন। এর আগে মানিকগঞ্জ, ঢাকার সাভার, বরিশাল, ময়মনসিংহ ও নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে চলন্ত বাসে নারী ধর্ষণের ঘটনা ঘটে।
১০ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহের ভালুকায় বাসে আটকে রেখে ১৩ বছরের এক কিশোরী পোশাককর্মীকে ধর্ষণ করে বাসের হেলপার। ৫ ফেব্রুয়ারি নরসিংদীতে বাসের ভেতরে এক নারীকে শ্লীলতাহানি করে বাসের চালক ইসমাইল হোসেন ও তার চার সহযোগী। জেলার শিবপুরের পুরানদিয়া বাসস্ট্যান্ড এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ২২ জানুয়ারি কলকাতা-ঢাকা মৈত্রী এক্সপ্রেসে নদীয়ার রেলস্টেশনে বাংলাদেশি এক নারীযাত্রী শ্লীলতাহানির শিকার হয়।২১ ডিসেম্বর নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে আনন্দ পরিবহণের যাত্রীবাহী বাসের ভেতরে ৮ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ করে বাসচালক। ৩ নভেম্বর গাজীপুর মহানগরের বাইমাইল এলাকায় নৌকায় তুলে এক পোশাক শ্রমিককে গণধর্ষণ করে ৪ বখাটে।
২৭ অক্টোবর চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় চলন্ত বাসে চালক এক তরুণীকে গণধর্ষণ করে। ১২ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে বার আউলিয়া ডিগ্রি কলেজ সংলগ্ন এলাকায় বাসে এক গৃহবধূকে ধর্ষণের চেষ্টা ও মাদক সেবনের অভিযোগে বাসের চালক জনি বড়ুয়া ও হেলপার মো. এহসানকে এক বছরের কারাদ- দেয় লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহবুবুল আলম। ১১ আগস্ট ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় লেগুনার চালক ও হেলপার মিলে ৭ম শ্রেণির ছাত্রীকে পালাক্রমে ধর্ষণ করে। ৮ আগস্ট রাজধানীর বনানীতে এক তরুণীকে প্রাইভেটকারে তুলে নিয়ে শ্লীলতাহানির চেষ্টা চালিয়েছে এক ব্যক্তি।
৯ এপ্রিল ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে চলন্ত বাসে স্বামীর সামনে এক নারীকে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। ১ আগস্ট নারায়ণগঞ্জে এক কিশোরীকে চলন্ত ট্রাকে গণধর্ষণ করে চালক ও হেলপার। ৩১ জুলাই রৌমারীতে পদ্মা পরিবহণের একটি বাসে গণধর্ষণের শিকার হয় এক কিশোরী। একই বছরের ১৩ মার্চ আলমডাঙ্গায় ইজিবাইক চালকসহ তিনজন মিলে এক স্কুলছাত্রীকে গণধর্ষণ করে। গত বছরের ২১ জানুয়ারি গাবতলী বাস টার্মিনালে ধর্ষণের অভিযোগে গাড়ির চালক ও হেলপারকে গ্রেপ্তার করে। ২০১৩ সালের ২৪ জানুয়ারি মানিকগঞ্জ এলাকায় চলন্ত বাসে গণধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন এক পোশাককর্মী। সেই থেকে শুরু। এর পর যেন ধারাবাহিকতা। ২০১৫ সালের মে মাসে কর্মক্ষেত্র থেকে ঘরে ফেরার পথে রাজধানীতে গণধর্ষণের শিকার হন এক গারো তরুণী। অ্যাকশন এইডের এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৪৯ শতাংশ নারী গণপরিবহণে এবং ৪৮ শতাংশ গণসেবা গ্রহণে অনিরাপদ বোধ করেন। রাতে পাবলিক বাসে চলাচলকারী অধিকাংশ নারীকেই প্রতিনিয়ত পড়তে হচ্ছে এমন ভয়ঙ্কর বিড়ম্বনায়। আইন ও সালিশকেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক শীপা হাফিজা বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে। এ জন্য কঠোর মনিটরিং প্রয়োজন।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বলেন, বর্তমানে বিভিন্ন যানবাহনে ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। এ ক্ষেত্রে পরিবহণ মালিকদেরও গাফিলতি আছে। কর্মী হিসেবে কাকে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে মালিকদের। পাবলিক বাসের পাশাপাশি সব রোডে ২৪ ঘণ্টা মহিলা বাস সার্ভিস চালু করলে বাসে ধর্ষণের প্রকটতা কমে আসবে বলে জানান তিনি।গত ১৮ এপ্রিল বিকালে শ্যামলী থেকে বান্ধবীকে নিয়ে কমলাপুরের উদ্দেশ্যে লাব্বাইক বাসে ওঠেন জাতীয় টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের এক ছাত্রী। ওই সময় বাসে কমপক্ষে ২০-২৫ জন লোক ছিল। বাংলামোটর পার হয়ে মালিবাগ ক্রস করে খিলগাঁও পুলিশ ফাঁড়ি পার হওয়ার পর লোকজন কমে যায়। খিলগাঁও ফ্লাইওভারে যখন বাস ওঠে তারাসহ লোক ছিলো চারজন। বাসাবোতেও বাসটা আর থামল না। মানুষ থাকা সত্ত্বেও বাসে লোক ওঠায়নি কন্ডাক্টর। বৌদ্ধমন্দির পার হওয়ায় তারা যখন নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
হঠাৎ পেছন থেকে তাদের দুজনকে মুখ-চোখ চেপে ধরে দুজন। অনেক চেষ্টার পর তারা লাফিয়ে নামতে সক্ষম হন। বিষয়টি একজন ট্রাফিক পুলিশকে জানানো হয়। তিনি দেখি বলে বাইক নিয়ে সোজা চলে গেলেন। আর দেখা গেলো না তাকে। ঘটনার শিকার ওই ছাত্রীদের একজন সামাজিক মাধ্যমে নিজের ফেসবুকে এভাবে স্ট্যাটাস দিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন। বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার কো-অর্ডিনেটর (ইনভেস্টিগেশন এন্ড ট্রেনিং) একেএম ওয়ালিউল ইসলাম লোনা বলেন, বাস শ্রমিকরা মূর্খ। তাদের মধ্যে শ্রমিকদের সচেতনতা বাড়াতে হবে। আইন সম্পর্কে এবং এর ভয়াবহ পরিণতি তাদের বোঝাতে হবে। এছাড়া এ ধরনের ঘটনার দ্রুত বিচার করতে হবে। রায়ের বিষয়টি সমস্ত মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে প্রচার করতে হবে। গণপরিবহণে শ্রমিক নিয়োগের ক্ষেত্রে মালিকদের জবাবদিহিতা থাকতে হবে। পাশাপাশি যাত্রীদেরও সচেতনতার বিকল্প নেই।
এএইচ/আমার সংবাদ