আকাশবার্তা ডেস্ক :
টাকায় সব ধরনের নেশাদ্রব্য মেলে কারাগারে। সেখানে চলছে অবৈধ মাদকের ব্যবসা। ভিআইপিসহ সাধারণ বন্দিরাও দেদার ব্যবহার করছে মোবাইল ফোন। এসব ব্যবসায় জড়িত রয়েছে অসাধু কারারক্ষীসহ কতিপয় কর্মচারী। ঢাকা কেন্দ্রীয়সহ দেশের সবগুলো কারাগারের প্রায় একই চিত্র। মাদক ব্যবসাসহ অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত অভিযোগে গত এক বছরে ২০ জনকে সাময়িক বরখাস্ত ও ৩ জনকে চাকরিচ্যুত করেছে কারা কর্তৃপক্ষ।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মধ্যেও কারাগারের ভেতরে মাদকদ্রব্যের প্রবেশ হতাশাজনক। এতে কারাগারের অপরাধীরা সংশোধনের পরিবর্তে আরো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে। সেটাই কিন্তু জাতির জন্য দুশ্চিন্তার বিষয়। অভিযোগ রয়েছে কয়েদি, জমাদার ও অসাধু কারারক্ষীরা মাদক ব্যবসায় জড়িত। ওই চক্রটিই কারাগারে মোবাইল ফোনের ব্যবসা করে। এক সময়ের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের নারী কারারক্ষী মাদক সম্রাজ্ঞী নাদিরা আক্তার আলো বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলো। সে গ্রেপ্তার পরবর্তী জামিন এবং চাকরি থেকে বরখাস্ত হয়েছেন। কিন্তু থেমে নেই তার মতোই সিন্ডিকেটের সদস্যরা।
গত বৃহস্পতিবার বিকেলে ইয়াবা বিক্রির চেষ্টার অভিযোগে কেরানীগঞ্জে অবস্থিত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ডেপুটি জেলার মোমিনুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এই কারাগারে তিনি নয় মাস ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। সেখানের জেলার মাহাবুবুল ইসলাম জানান, বুধবার বেলা সাড়ে তিনটার দিকে এক লোককে কারা ফটকে ঘোরাফেরা করতে দেখে সন্দেহ হলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ওই ব্যক্তি জানান, তার বাড়ি কারাগারের পাশে। তিনি স্থানীয় চেয়ারম্যানের লোক বলে পরিচিত। তাকে ৫৯ পিছ ইয়াবা বিক্রি করে দেওয়ার জন্য কারা ফটকে ডেকে আনেন ডেপুটি জেলার মোমিনুল ইসলাম। এ সময় তার হাতে ৫৯পিস ইয়াবাও ছিল।
এ ঘটনা তিনি জানার পরপরই বিষয়টি কারা তত্ত্বাবধায়ককে জানান। তখনই তা কারা মহাপরিদর্শকে জানানো হয়। এ প্রতিবেদন কারা মহাপরিদর্শকের কাছে পাঠানোর পর বিকেলে মোমিনুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
কারা সূত্র জানায়, মাদক সেবন, ব্যবসা ও কয়েদিদের মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে দেওয়ার অপরাধে গত ১ বছরে অন্তত ২০ জনকে সাময়িক বরখাস্ত ও ৩ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এর আগে কয়েক বছরে এ ধরনের অভিযোগে দেশের বিভিন্ন কারারক্ষীসহ সংশ্লিষ্ট অন্তত ৬০ জনকে বরখাস্ত করা হয়েছে। শাস্তি পেতে হয়েছে অনেককে। কারাগারের ভেতরে মাদকের বেচাকেনা রোধে গঠিত বিশেষ টিমও কাজ করছে। সূত্র জানায়, বহনে সহজলভ্য বলে কারাগারে ইয়াবার পর গাঁজার চাহিদা ও সরবরাহ বেশি। বাইরের চেয়ে অন্তত ৫ গুণ কখনা কখনো ১০ গুণ বেশি দামে বিক্রি হয় এসব নেশাদ্রব্য। বেশি টাকার লোভ সামলাতে না পেরে কারারক্ষীরা জড়িয়ে পড়ে মাদক সাপ্লাইয়ে।
কারাসূত্র জানায়, বন্দিরা একসময় পাউরুটির ভেতর, পশ্চাৎদেশে, সিগারেটের ভেতর ইয়াবা বহন করতো। এখন শুকনো মরিচ, পেঁয়াজ এমনকি ছোটো ছোটো পলিথিনে প্যাক করে খেয়ে পেটের মধ্যে বহন করে কারাগারে ঢুকছে। এরা প্রতিনিয়ত কৌশল বদল করে। কখনো লুঙ্গির সেলাইয়ের ভাঁজে, শার্টের কলারের সেলাই কেটে, জুতার সুকতলা কেটে ইয়াবা ঢোকানো হয়। ইয়াবাপাচারে এদের সহায়তা করছে কতিপয় অসাধু কারারক্ষী ও কর্মচারী। দেশের বিভিন্ন কারাগারে প্রায় ৩ হাজার মাদকসেবী রয়েছে। আদালতে আসা-যাওয়ার পথে তাদের সাথে দেখা করতে আসা লোকজনের মাধ্যমে মাদকদ্রব্য সংগ্রহ করে। অনেক কারারক্ষীই বন্দিদের কাছে মাদকদ্রব্য বিক্রি করে। অথবা বন্দিদের কাছে মাদক সরবরাহের ব্যবস্থা করে।
সূত্রমতে, মাদক ব্যবসায় কারারক্ষীদের সম্পৃক্ততার প্রমাণে এক বছরের মধ্যে কাশিমপুর কারাগার-১-এর তিনজন, কারাগার-২-এর পাঁচজন, হাইসিকিউরিটি কারাগারের চারজন, শরীয়তপুর কারাগারের পাঁচজন, নরসিংদী কারাগারের দুজন, টাঙ্গাইল, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ কারাগারের একজন এবং সম্প্রতি কাশিমপুর কারাগারের কারারক্ষী বেলায়েত হোসেনসহ তিনজনকে ৮শ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট ও এক কেজি গাঁজাসহ গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে এসব ঠেকাতে হিউম্যান বডি স্ক্যানার মেশিন আমদানি করা হয়েছে। শিগগির এগুলো চালু হতে যাচ্ছে।
সূত্র জানায়, কারাগারে মোবাইল ফোনের নিয়মিত ব্যবসা চালু আছে। রাতে ঘণ্টা হিসেবে মোবাইল ভাড়া পাওয়া যায়। হাজার টাকার বিনিময়ে সারারাত কথা বলার সুযোগ মেলে। দুইশ টাকায় ঘণ্টা। আবার কয়েকজন বন্দি মিলে সেট কিনে তা ব্যবহার করছে। অসাধু কারারক্ষীরা অল্প টাকার সেট বন্দিদের কাছে চড়া দামে বিক্রি করে। আর একটি চক্র মোবাইল ফোনের ব্যবসা করছে। কারা কর্মকর্তারা বলেন, বর্তমানে কারাবন্দিদের মধ্যে ৩৫ দশমিক ৯৭ শতাংশই মাদকাসক্ত। একটি কারাগারে সাত থেকে আট হাজার বন্দির মধ্যে যদি তিন হাজার বন্দি সবসময়ই চেষ্টা করে মাদক প্রবেশ করাতে আর বিভিন্ন শিফট মিলিয়ে যদি ১০০ কারারক্ষী তা ঠেকাতে দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে বিষয়টা কষ্টসাধ্য। বন্দি থাকা অবস্থায় তাদের সংশোধনের কথা থাকলেও সেটি হচ্ছে না মাদকের সরবরাহ বন্ধ করতে না পারা।
এএইচ/আমার সংবাদ