আকাশবার্তা ডেস্ক :
পাটের বহুমুখী ব্যবহার ও সম্প্রসারণ এবং পরিবেশ সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে ২০১০ সালে পণ্যের মোড়কীকরণে পাটের ব্যাগ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়। আইনে নির্ধারিত ১৯টি পণ্যের মোড়কীকরণে পাটের ব্যাগ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হলেও দেশের বিখ্যাত কোম্পানিগুলোই এ আইন উপেক্ষা করছে। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সঠিকভাবে মনিটরিংয়ের অভাবেই এই আইন উপেক্ষিত হচ্ছে বলে মনে করেন পরিবেশ সংরক্ষণকারীরা।
তারা মনে করেন, দিনে দিনে পরিবেশ ধ্বংসকারী পলিথিন ও প্লাস্টিকের ব্যাগ ব্যবহার যেখানে কমার কথা সেখানে বাড়ছে। ঢাকার বিভিন্ন বাজার ঘুরে এর সত্যতাও মিলে। বসুন্ধরা, সিটি গ্রুপের তীর, ফ্রেস, এসিআই, তৃপ্তি, মোরগ মার্কা, সেনাকল্যাণসহ নামিদামি কোম্পানির নির্ধারিত পণ্যগুলোতে ব্যবহার করা হচ্ছে না পাটের ব্যাগ। এসব কোম্পানির আটা, ময়দা, চিনি, ভুট্টার ভূষি মোড়কীকরণে ব্যবহার করা হচ্ছে না পাটের ব্যাগ।
অন্যদিকে সম্প্রতি নতুন করে পোল্ট্রি ও ফিশ ফিডের মোড়কে পাটের ব্যাগ ব্যবহার বাধ্যতমূলক করা হলেও তা ব্যবহার থেকে দূরে রয়েছে। এছাড়াও চাল, পেঁয়াজ, রসুন, সার, ডাল, মরিচ, হলুদ, ধনিয়ায় ব্যবহার করা হচ্ছে না পাটের ব্যাগ। শুধু ধান বাজারজাত করণে এর ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়।
অন্যদিকে চাল বাজারজাত করণেও কিছু কিছু কোম্পানি পাটের ব্যাগ ব্যবহার করে। তবে প্লাস্টিকের ব্যাগবিশিষ্ট অনেক চাল রয়েছে বাজারে। আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নির্ধারিত ১৯টি পণ্যের প্রায় সবগুলোই বাজারজাত করছে পাটের ব্যাগ ছাড়া। এ বিষয়ে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের গাফিলতি ও অলসতাকে দায়ী করছে বিশিষ্টজনরা।
আইনে বলা হয়েছে, কোনো প্রতিষ্ঠান এ আইন না মানলে সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদন্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দ-ের বিধান রয়েছে। দ্বিতীয়বার একই অপরাধ করলে শাস্তি সর্বোচ্চ দন্ডের দ্বিগুণ হবে।
জানা যায়, ২০১৩ সালের ৩ জুন জারি করা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ধান, চাল, গম, ভুট্টা, সার, চিনি সংরক্ষণ, সরবরাহ ও মোড়কীকরণে পাটের বস্তা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়। সবমিলিয়ে ১৯টি পণ্য সংরক্ষণ, সরবরাহ ও মোড়কীকরণে পাটের বস্তা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। শুরুর দিকে ছয় পণ্যে ২০ কেজি বা তার বেশি পরিমাণ পণ্য পরিবহণ ও সংরক্ষণে পাটের ব্যাগ ব্যবহার করলেই চলত।
তবে ২০১৫ সালের ১৭ ডিসেম্বরে সেটি বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করে মন্ত্রণালয়। তখন যেকোনো পরিমাণ ধান, চাল, গম, ভুট্টা, সার, চিনি পরিবহণ ও সংরক্ষণে পাটের ব্যাগ ব্যবহারে কড়াকড়ি করা হয়।
জানা গেছে, নতুন করে ২০১৭ সালের ২৪ জানুয়ারি আগের ৬টি পণ্যের সাথে আরও ১১টি পণ্যের মোড়ক হিসেবে পাটের ব্যাগ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়। সম্প্রতি পোল্ট্রি ও ফিশ ফিডের সংরক্ষণ ও পরিবহণে পাটের ব্যাগ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়। নতুন দুটি পণ্যসহ বর্তমানে ১৯টি পণ্যের ক্ষেত্রে পাটের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হলেও আইন আইনের জায়গায় রয়ে গেছে। বাস্তবে এর প্রয়োগ দেখা যায় না মাঠে-ময়দানে।
গতকাল পুরনো ঢাকার মৌলভীবাজারে গিয়ে দেখা যায়, বসুন্ধরা গ্রুপের ৫০ কেজির চিনি বস্তা, তীরের ৫০ কেজি আটা, ময়দা, চিনি, ফ্রেসের আটা, ময়দা, চিনিসহ চাল, পেঁয়াজ, মরিচ, হলুদ, ধনিয়া, গম, ভুট্টা, ভুট্টার ভূষিসহ নির্ধারিত পণ্যের অধিকাংশতেই ব্যবহার হচ্ছে না পাটের ব্যাগ। এসব পণ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে পরিবেশ ধ্বংসকারী প্লাস্টিক ও পলিথিনের বস্তা। এছাড়াও পোল্ট্রি ও ফিশ ফিডের মোড়কীকরণে ব্যবহার করা হচ্ছে প্লাস্টিক বস্তা।
এ ব্যাপারে পোল্ট্রি ফিশ শিল্প মালিক সমিতির সদস্যরা পাটের ব্যাগ ব্যবহারে দেখাচ্ছে খোঁড়া যুক্তি। তাদের ভাষ্য, পাটের বস্তা ব্যবহারে খাবারের গুণগত মান নষ্ট হয়ে যায়। কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেন পাটের বস্তায় যে ছিদ্র থাকে তা দিয়ে বাতাস প্রবেশ করে। ফলে এর গুণগত মান নষ্ট হয়ে যায়। তাই তারা পাটের ব্যাগ ব্যবহার করছে না। আইনের কথা স্মরণ করিয়ে দিলে তারা বলেন, এই আইন করার পূর্বে আমাদের সাথে কথা বলা হয়নি। আমরা আইন করার পর এর প্রতিবাদ জানিয়েছি। আশা করছি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারটা বিবেচনা করবেন।
এ ব্যাপারে সিপি ফুড এন্ড ফিডস থাইল্যান্ডের জোন পরিচালক আনিসুর রহমান জানান, পোল্ট্রি বা ফিশের খাবারে পাটের বস্তা ব্যবহার করলে এর গুণগতমান ঠিক থাকবে না, তাই আমরা এটা ব্যবহার করছি না। তবে একথার সাথে একমত হতে পারেননি বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব ফয়জুর রহমান চৌধুরী। তিনি বলেন, আমরা আইন করার পূর্বে তাদের সাথে মন্ত্রী মহোদয়সহ আমরা কয়েকবার বৈঠক করেছি। এবং আমরা বলেছি আপনাদের খাবারের মান যেভাবে ঠিক থাকে আমরা সে ধরনের ব্যাগ তৈরি করে দেব যা খাদ্য পরিবহণে ও সংরক্ষণে কোনো সমস্যা হবে না।
অন্যদিকে বসুন্ধরা গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক নাসিমুন হাই নির্ধারিত পণ্যে পাটের ব্যাগ ব্যবহার করছে জানিয়ে বলেন, আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই আমরা যে সমস্ত পণ্যে পাটের ব্যাগ ব্যবহার বাধ্যতামূলক সেখানে আমরা ব্যবহার করছি। তিনি আরও বলেন, এ আইন করার পূর্বে আমাদের সাথে পরামর্শ করা হয়েছে। আমরা সেখানে এর পক্ষে মতামত দিয়েছি। তাহলে আমরা এই আইন মানবো না কেন? বলে প্রশ্ন করেন প্রতিবেদককে। তবে বাস্তবতা দেখা গেছে পুরোই ভিন্ন। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, তাদের অনেক পণ্যই প্লাস্টিকের ব্যাগে মোড়কীকরা।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নাসিমুল হাই বলেন, এমন হওয়ার কথা না। তবে মিসটেক হতে পারে। আমরা ব্যাপারটা খতিয়ে দেখবো। সাধারণ মানুষের রয়েছে এ ব্যাপারে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। তারা মনে করেন, বাংলাদেশে আইন হয় দেখানোর জন্যে। যা শুধুমাত্র সাধারণ মানুষের জন্য প্রযোজ্য। প্রভাবশালীদের জন্য আইন প্রয়োগ হয় না বললেই চলে। তারা মনে করেন আইনের চোখে সবাই সমান। সুতরাং সকলকে আইনের আওতায় আনা উচিত। আইন যেন প্রয়োগ করা হয় সেটাই সরকারের কাছে আশা করেন তারা। বড় কোম্পানি বা প্রভাবশালী বলে যেন আইন কারো প্রতি উদাসীন না হয় এমনটাই প্রত্যাশা করেন রাজধানীর বাসিন্দারা। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা যায়, ফিল্ডে মোবাইল কোর্ট চলছে। আইন কার্যকরের ব্যাপারে সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে জানান।
এই আইনের আওতায় ১৯টি পণ্য হচ্ছে মরিচ, হলুদ, পেঁয়াজ, আদা, রসুন, ডাল, ধনে, আলু, আটা, ময়দা, তুষ-খুদ-কুঁড়া, ধান, চাল, গম, ভুট্টা, সার, চিনি পোল্ট্রি ফিড ও ফিশ ফিড। এসব পণ্যে পাটের ব্যাগ ব্যবহারে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে আরও ব্যাপকহারে পদক্ষেপ নেয়া দরকার বলে মনে করেন দেশের বিশিষ্টজনরা। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় এসব পণ্যে পাটের ব্যাগ ব্যবহার শত ভাগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কঠোর পদক্ষেপ নিবেন বলে জানিয়েছেন।