আকাশবার্তা ডেস্ক :
কিছুতেই বন্ধ হচ্ছে না ইভটিজিং। বরং বখাটেরা যেন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। বেড়েছে ধর্ষণের ঘটনা। অপমান সহ্য করতে না পেরে কেউ কেউ আত্মহত্যার পথও বেছে নিচ্ছে। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, ইভটিজিং এখন সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। ভিনদেশী অপসংস্কৃতি, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের অবক্ষয়, ছোট পরিবার এবং বিশেষ করে বেকারত্বই বখাটেপনা ও ইভটিজিং বৃদ্ধির কারণ। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত না থাকায় সামাজিক এ অপরাধ রোধ করা যাচ্ছে না। আমরা কেন যেন মনুষত্ব্যহীন হয়ে পড়েছি। শিক্ষকের কাছে ছাত্রী, মালিকের কাছে কর্মজীবী নারী, আশ্রয়দাতার কাছে অসহায় কিশোরীও নিরাপদ নয়। সম্প্রতি কয়েকটি ধর্ষণের ঘটনায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন অভিভাবকরা।
গত রোববারের ঘটনা। চাচার হাত ধরে হেঁটে গন্তব্যে ফিরছিলো ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার নবম শ্রেণির এক ছাত্রী (১৪)। রাজাপুরের পশ্চিম চাড়াখালী এলাকায় পরিচিত পথ। কিন্তু হঠাৎই তাদের পথরোধ করে বখাটেরা। রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে যায় ওই ছাত্রীকে। বখাটেদের নেতৃত্বে ছিলো হেলাল তালুকদার। ছাত্রীটিকে তুলে নেয়া হয় একটি পরিত্যক্ত ঘরে। ধর্ষণ করা হয় কিশোরীকে। শুধু তাই নয়, ছাত্রীটির দাদার কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা এনে দিতেও বলে তারা। ঘরের ভেতর আটকে রাখা ছাত্রীকে দ্বিতীয় দফায় ধর্ষণের চেষ্টা চালায় হেলালের সহযোগী স্থানীয় বাবুল তালুকদার।
খবর পেয়ে গভীর রাতে ছাত্রীটিকে উদ্ধার করে পুলিশ। গত সোমবার দুপুরে ওই ছাত্রীকে ঝালকাঠি সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ধর্ষণের ঘটনা সহ্য করতে না পেরে লজ্জায় অপমানে গলায় ফাঁস দিয়ে পৃথিবী থেকে চির বিদায় নিয়েছে কিশোরী সুখী আক্তার। ভুক্তভোগী সুখী ঝালকাঠির আমুয়া বালিকা উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলো। স্থানীয় বখাটে সাব্বির মেয়েটিকে স্কুলে যাওয়া-আসার পথে উত্ত্যক্ত করতো। গত ১৮ সেপ্টেম্বর স্কুল থেকে বাসায় ফিরছিলো সুখী। পথে বখাটে সাব্বির সুখীকে টেনেহিঁচড়ে হাসপাতাল কোয়ার্টারের ছাদে তুলে নেয়। সেখানে শ্লীলতাহানির শিকার হয় সে। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় আলোচনা-সমালোচনা চলে। কিন্তু লজ্জায়-অপমানে আত্মহত্যা করে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পাওয়া মেধাবী এ শিক্ষার্থী। টাঙ্গাইলের ঘাটাইলের ঘটনা এটি। সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রী প্রাইভেট পড়তেন তার মাদ্রাসারই এক শিক্ষকের কাছে।
প্রতিদিনের মতো গত ১৫ সেপ্টেম্বর ভুক্তভোগী ছাত্রীটি প্রাইভেট পড়তে গিয়ে শ্লীলতাহানির শিকার হন। বাসায় ফিরে ছাত্রীটি তার অভিভাবকের কাছে ঘটনা প্রকাশ করে। তার বাবা-মা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা কমিটির কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। গত সোমবার এলাকার লোকজন অভিযুক্ত শিক্ষক গোলাম হোসেনকে (৪০) আটক করে পুলিশ দেয়।
পুড়িয়ে দেয়া হয় তার মোটরসাইকেল। গত বুধবার পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে দশম শ্রেণির এক ছাত্রীকে শ্লীলতাহানির অভিযোগে ওঠে। এরই জের ধরে ওই স্কুলের শিক্ষার্থীরা পরদিন বৃহস্পতিবার সকালে বিক্ষোভ মিছিল ও ক্লাস বর্জন করে। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। কাঠালতলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অভিযুক্ত সিনিয়র সহকারী শিক্ষক (গণিত) মো. আবদুল গাফ্ফারের বাসায় কোচিং সেন্টারে এ ঘটনা ঘটে।
গাজীপুরের শ্রীপুর পৌরসভা এলাকার তৃতীয় শ্রেণির এক ছাত্রী (১২) ধর্ষণের শিকার হয়ে ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা হয়েছে। শ্রীপুর থানায় দায়ের করা মামলায় গত রোববার আসামি জহিরুল ইসলামকে (৩৫) গ্রেপ্তার করে পুলিশ। থানা সূত্র জানায়, ভুক্তভোগী ছাত্রীটি অত্যন্ত গরিব। আসামির আশ্রয়ে তার জমিতে অস্থায়ী ঘর তুলে বসবাস করতো। পঞ্চগড় জেলার বোদা পাইলট গার্লস স্কুল এন্ড কলেজের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে নবম শ্রেণির এক ছাত্রীকে শ্লীলতাহানির অভিযোগ ওঠে।
গত ২৬ আগস্ট বোদা পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাক রাজুর বোদা থানাপাড়াস্থ বাসায় প্রাইভেট পড়তে গিয়ে ওই শিক্ষার্থী শ্লীলতাহানির শিকার হয়। পটুয়াখালীর গলাচিপায় বখাটেদের হুমিকর মুখে এক মাস যাবত বিদ্যালয়ে যেতে পারছে না বকুলবাড়িয়া ইউনিয়নের পাতাবুনিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির এক ছাত্রী। ওই ছাত্রীর পরিবারের অভিযোগ, প্রতীকার চেয়ে পুলিশ প্রশাসনের কাছে অভিযোগ দেয়ার পরও প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে বখাটেরা। বখাটের হুমকিতে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন তারা। ইভটিজিং প্রতিরোধে ঢাকাসহ সারাদেশেই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত নামানো হয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই বখাটেপনার শাস্তিস্বরূপ বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেয়া হচ্ছে। অনেককে জনসমক্ষে কান ধরে ওঠবস করিয়ে তিরস্কার এবং মুচলেকা প্রদান ও প্রতিজ্ঞা করানো হচ্ছে। এরপরও কমছে না ইভটিজিং, বরং এটা দিন দিন বাড়ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মাসুদা এম. রশীদ চৌধুরী বলেন, এখন যা ঘটছে তাকে ইভটিজিং বলা চলে না। এটা রীতিমতো সন্ত্রাস। এখন যারা এটা করছে, তারা নিছক যৌন চিন্তাধারা ও এক ধরনের বিকৃত মানসিকতার কারণেই এটা করছে। দুই-চার মাসের জেল দিয়ে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। আইন সংশোধন করে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার কর্মকর্তা এ.কে.এম ওয়ালিউল ইসলাম লোনা বলেন, বর্তমান যুগে আধুনিক প্রযুক্তি যেমন- মোবাইল ফোন, ডিশ, ইন্টারনেটের সুফলের পাশাপাশি এর অপব্যবহার ইভটিজিং বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। এটা বন্ধে ভ্র্যাম্যমাণ আদালত অব্যাহত রাখতে হবে। পারিবারিক শাসন থাকতে হবে। পরিবার থেকে নৈতিকতার শিক্ষাই বড় শিক্ষা।
সূত্র : দৈনিক আমার সংবাদ