আকাশবার্তা ডেস্ক :
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিতর্কিত ৯টি ধারা সংশোধনের দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন দেশের পত্রিকাগুলোর সম্পাদকরা। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকে স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিপন্থী উল্লেখ করে, আগামী জাতীয় সংসদ অধিবেশনে আইনটি সংশোধন করে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও স্বাধীন সাংবাদিকতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সম্পাদক পরিষদ।
সোমবার (১৫ অক্টোবর) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে সম্পাদক পরিষদের ডাকা মানববন্ধনে লিখিত বিবৃতি পাঠ করেন সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম।
বিবৃতিতে মাহফুজ আনাম বলেন, ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০০৮’ পাশ হওয়ার আগে থেকেই এই আইনটির বিভিন্ন ধারা নিয়ে আমরা প্রতিবাদ জানিয়ে আসছিলাম। এই আইনটি স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মুক্ত গণমাধ্যমের পরিপন্থী।’ ‘আমরা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিরোধী নয়, কিন্তু বর্তমান আইন শুধু সাইবার জগৎ নয়, স্বাধীন গণমাধ্যমের ও পরিপন্থী।’
সাংবাদিক মহল ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের আলোচনার মধ্যেই গত ১৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা বিল-২০১৮’ পাস হয়। এ আইনের বহুল আলোচিত ৩২ ধারাসহ নয়টি ধারা নিয়ে সাংবাদিক সমাজ আপত্তি জানিয়ে আসছে।
এসব ধারা রেখে আইনটি বাস্তবায়ন হলে ‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য হুমকি’ হয়ে উঠবে আপত্তি জানিয়ে সম্পাদক পরিষদ মানববন্ধনের ঘোষণা দিয়েছিল এর আগে আরও একবার। এর প্রেক্ষিতে তাদের সঙ্গে বৈঠকেও বসেন আইন, তথ্য এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী। সেখানে গণমাধ্যমের আপত্তিতে থাকা ধারাগুলো আলাপ–আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়।
এরপর গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ আইন প্রসঙ্গে বলেন, যাদের অপরাধী মন নেই, তাদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে নোংরামি ঠেকাতেই এ আইন করা হয়েছে।
এরপর ৮ অক্টোবর সেই ধারাগুলো নিয়েই ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮’-এ স্বাক্ষর করেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। তার সম্মতির ফলে আইনটি কার্যকর হয়ে যায়।
এরপর এ নিয়ে ১৩ অক্টোবর জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন ডাকে সম্পাদক পরিষদ। সেখানে পরিষদের সদস্য ও ভোরের ডাক সম্পাদক শ্যামল দত্ত বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে সরকারের তিনজন মন্ত্রী যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা বরখেলাপ করেছেন।
তিনি বলেন, মুক্ত সংবাদমাধ্যম, বাক স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিপন্থি কালাকানুন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাস করায় আমরা হতাশ, ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত। এ আইনের ৮, ২১, ২৫, ২৮, ২৯, ৩১, ৩২, ৪৩ ও ৫৩ ধারাগুলো স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
মানববন্ধনে সম্পাদক পরিষদের পক্ষ থেকে সাত দফা দাবি পেশ করা হয়।সাত দফা দাবি ঘোষণার পর সম্পাদকরা ১০ মিনিট নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। দাবিগুলোর মধ্যে আছে-
*ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৮, ২১, ২৫, ২৮, ২৯, ৩১, ৩২, ৪৩, ৫৩ ধারা অবশ্যই যথাযথভাবে সংশোধন করতে হবে।*এসব সংশোধনী বর্তমান সংসদের শেষ অধিবেশনে আনতে হবে। *পুলিশ বা অন্য কোনো সংস্থার মাধ্যমে কোনো সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে তল্লাশি চালানোর ক্ষেত্রে তাদেরকে শুধু নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু আটকে দেওয়ার অনুমতি দেওয়া যাবে। কিন্তু কোনো কম্পিউটারের ব্যবহার বন্ধ করার অনুমতি দেওয়া যাবে না। তারা শুধু তখনই প্রকাশের বিষয়বস্তু আটকাতে পারবে, যখন সংশ্লিষ্ট সংবাদ প্রতিষ্ঠানের সম্পদকের সঙ্গে আলোচনা করে কোনো ওই বিষয়বস্তু আটকে যাওয়া উচিৎ সে বিষয়ে যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে পারবে।
*কোনো সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের কোনো কম্পিউটার ব্যবস্থা আটকে দেওয়া বা জব্দ করার ক্ষেত্রে অবশ্যই আদালতের আগাম নির্দেশ নিতে হবে। *সংবাদমাধ্যেমের পেশাজীবীদের সাংবাদিকতার দায়িত্বের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপরাধের ক্ষেত্রে প্রথমেই আদালতে হাজির হওয়ার জন্য তাদের বিরুদ্ধে সমন জারি করতে হবে। এবং সংবাদমাধ্যমের পেশাজীবীদের কোনো অবস্থাতেই পরোয়ানা ছাড়া ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়া আটক বা গ্রেফতার করা যাবে না।
*সংবাদমাধ্যমের পেশাজীবী দ্বারা সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়েরে গ্রহণযোগ্যতা আছে কি-না তার প্রাথমিক তদন্ত প্রেস কাউন্সিলের মাধ্যম করা উচিৎ। এই লক্ষ্যে প্রেস কাউন্সিলকে যথাযথভাবে শক্তিশালী করা যেতে পারে।*এই সরকারের পাশ করা তথ্য অধিকার আইনকে দ্ব্যর্থহীনভাবে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ওপর প্রাধান্য দেওয়া উচিৎ। এই আইনে নাগরিক ও সংবাদমাধ্যমের জন্য যেসব স্বাধীনতা ও অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে, সেগুলোর সুরক্ষা অত্যাবশ্যক।
মানববন্ধনে আরো উপস্থিত ছিলেন, প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, বাংলাদেশ প্রতিদিন সম্পাদক নঈম নিজাম, কালের কণ্ঠ সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন, ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস সম্পাদক শহীদুজ্জামান খান, দি ইনডিপেনডেন্ট সম্পাদক সামসুর রহমান মোমেন, মানবজমিন সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, যুগান্তর সম্পাদক সাইফুল আলম, ইনকিলাব সম্পাদক এএমএম বাহাউদ্দিন, নিউ এজ সম্পাদক নুরুল কবির, সংবাদ সম্পাদক খন্দকার মুনীরুজ্জামান, নয়াদিগন্ত সম্পাদক আলমগীর মহিউদ্দিন, বণিক বার্তা সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ, ঢাকা ট্রিবিউন সম্পাদক জাফর সোবহান, করতোয়া সম্পাদক মো. মোজাম্মেল হক, সমকাল ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি প্রমুখ।