বিশেষ প্রতিবেদন
বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার বয়স খুব বেশি সময় অতিবাহিত হয়নি। দেশ স্বাধীনতা লাভের মাত্র সাড়ে ৩ বছরের মাথায় নির্মমভাবে হত্যা করা হয় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তাঁর পরিবারবর্গকে। নির্মম, নিষ্ঠুর এবং নৃশংস এই হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে ইতিহাসের একটি কলংকজনক অধ্যায় সূচিত হয়। এরপর থেকে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার কবর দিয়ে বার বার বাংলাদেশ সামরিক শাসনের আদলেই পরিচালিত হয়।
১৯৯০ সালে শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়ার যুগপথ আন্দোলনের মাধ্যমে ৬ ডিসেম্বর এরশাদ সরকারের পতনের মধ্যদিয়ে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় ফিরে আসে বাংলাদেশ। ৯১’র নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্টতা নিয়ে ক্ষমতায় আসীন হয় বিএনপি। কিন্তু ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারীর বিতর্কিত নির্বাচনের মধ্যদিয়ে ক্ষমতা থেকে বিদায় নেয় বিএনপি।
এরপর নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১২ জুনের নির্বাচনে ২১ বছর পর ক্ষমতায় আসীন হয় আওয়ামী লীগ। দেশ পরিচালনায় আওয়ামী লীগ সফল হলেও ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনে ক্ষমতায় আসে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট। এ নির্বাচনে বিএনপি একাই দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্টতা লাভ করে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় অপশাসন ও দুর্নীতির কারণে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিএনপির চরম ভরাডুবি হয়।
এরপর থেকে টানা দুই মেয়াদে অধ্যাবদি পর্যন্ত দেশ পরিচালনা করছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার। দীর্ঘমেয়াদি দেশ পরিচালনার কারণে দেশের সার্বিক উন্নয়ন অনেকটাই দৃশ্যমান। পদ্মাসেতু, মেট্রোরেল, ঢাকা শহরের আধুনিকায়ন, বিদ্যুৎ উন্নয়ন, পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন, পায়রা সমুদ্র বন্দর নির্মাণসহ শত শত মেঘাপ্রকল্পসহ সামগ্রিক উন্নয়ন হলেও কেন দেশের মানুষ পরিবর্তন চায়।
পথে প্রান্তরে, প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে চষে বেড়িয়ে কেউ কী এর সঠিক উত্তর খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করেছে? হাজারো উন্নয়নের পরও কেন মানুষ পরিবর্তন প্রত্যাশা করবে? এর উত্তর খোঁজার সময় হয়েছে। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় রাষ্ট্রিয় অব্যবস্থাপনার কারণে সাধারণ মানুষ যতটা না ত্যক্ত বিরক্ত। তার চেয়ে বেশি ত্যক্ত বিরক্ত এবং ক্ষুব্ধ এলাকাভিত্তিক ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের অতি উচ্চাবিলাস এবং ক্ষমতার অপব্যবহার। সাধারণ মানুষের মনে জমে থাকা বিন্দু বিন্দু ক্ষোভের বর্হিপ্রকাশ ঘটে জাতীয় নির্বাচনে। ভোটের রাজনীতিতে কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতার অপপ্রয়োগের চেয়ে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের দুর্বৃত্তায়ন একটি দলের জন্য নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয় ডেকে আনে।
নানা মতের নানা পথের মানুষের সাথে মিলেমিশে গ্রামের অতি সাধারণ মানুষের ক্ষোভ-দুঃখের কথাগুলো জানার অনেক চেষ্টা করেছি বিগত বছরগুলোতে। খুব কাছাকাছি গিয়ে কথা বলে সাধারণ মানুষের যেসব ক্ষোভের বিষয়গুলো জানা গেছে তাতে ফুটে উঠেছে না বলা হাজারো ক্ষোভের কথা। যা কল্পনাকেও হার মানিয়েছে। কীসের এত ক্ষোভ দারিদ্রপীড়িত এসব মানুষের। কেন তারা এতটা ক্ষুব্ধ, কেন ক্ষমতাসীনদের প্রতি মানুষের আস্থার সংকট। কীসে তাদের এত ভয়।
যখন যে দল ক্ষমতায় ছিল, প্রায় প্রত্যেক সরকারের সময়ে সাধারণ মানুষ ক্ষমতাসীনদের প্রতি বিমুখ থাকেন। এর কারণ খুবই ভয়াবহ। প্রান্তিক জনগোষ্টির মানুষের কষ্টের কারণগুলো কোনো রাজনৈতিক দলের নেতারাই খুঁজে দেখার চেষ্টা করেনি। গ্রামের অপশাসন, শালিস বাণিজ্য, জায়গা-জমি সংক্রান্ত বিরোধে প্রতিপক্ষের প্রতি সরকারি দলের কর্মীদের নির্মম আচরণ, নারী সংক্রান্ত ঘটনায় জড়িত হওয়া, প্রভাব বিস্তারের নামে গ্রামের নীরিহ মানুষের সাথে অসদাচরণ, একটি চড়-থাপ্পড়, বা কিল-ঘুষি, চাঁদাবাজি, প্রবাস ফেরত মানুষের কাছ থেকে টাকা আদায়, বিয়ে-শাদীর অনুষ্ঠানে গিয়েও চাঁদাবাজি, গ্রাম কেন্দ্রীক বাজারগুলোর ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়সহ ছোট-খাটো বিভিন্ন কারণে ক্ষমতাসীনদের প্রতি মানুষ মুখ ফিরিয়ে নেয়। যার বিস্ফোরণ ঘটে জাতীয় নির্বাচনের ফলাফলে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাষ্ট্রিয় হাজারো উন্নয়ন এবং সুযোগ-সুবিধা ভোগ করলেও সাধারণ মানুষ মাত্র ৫ বছর পর ওই দলকে আর ভোট দিতে চায়না। তবে গ্রামীণ এসব অপকর্ম বা অপশাসনের সাথে সবসময় জড়িত থাকে সুবিধাবাদি একশ্রেণির দলছুট মানুষ। যারা সবসময় ক্ষমতাসীন দলের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থাকে। এই শ্রেণির কর্মীরা বা সুবিধাভোগিরা সবসময় সরকারি দল। ক্ষমতার কেন্দ্র বিন্দু থেকে তৃণমূলের এমন নির্মম অপশাসনগুলো দূর করা সম্ভব না হলে কোনো রাজনৈতিক দলই তাদের উন্নয়নের সুফল ভোগ করতে পারবেনা।
তৃণমূলের এসব অপশাসনের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হলে যেসব বিষয়গুলো প্রয়োগ করা প্রয়োজন। তাহলো, ১. স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তথা পুলিশ প্রশাসনকে নিরপেক্ষভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দিতে হবে, ২. সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজ কর্মীদের দলের দায়িত্ব দেওয়া যাবেনা, ৩. জেলা-উপজেলা নেতাদের সাথে অপরাধী এসব কর্মীদের আস্ফালনের সুযোগ দেওয়া যাবেনা, ৪. দলের দায়িত্বে থেকে কেউ অপরাধ করলে তাৎক্ষণিক পদ কেড়ে নেওয়াসহ আইনে সোপর্দ করতে হবে, ৫. প্রশাসন এবং জেলা-উপজেলা নেতাদের সমন্বয়ে এসব কর্মকান্ড প্রতিরোধের জন্য মনিটরিং সেল গঠন করতে হবে, ৬. মাদক ব্যবসায়ীদের দলের কর্মী হওয়ার সুযোগ বন্ধ করতে হবে। ক্ষমতাসীন যে কোনো রাজনৈতিক দলের জন্য ভবিষ্যতে এসব অবশ্যই করণীয় হিসাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তা হলে, সরকারের হাজারো জনবান্ধব কর্মসূচি এবং উন্নয়ন ভেস্তে যাবে এসব গুটিকয়েক নেতা-কর্মীর অপকর্মের কারণে।
মো. আলী হোসেন- সাংবাদিক ও লেখক
ahossain640@gmail.com