আকাশবার্তা ডেস্ক :
চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে ডাক্তার সেজে সহজ-সরল রোগীদের সাথে প্রতারণা করে যাচ্ছে রুহি দাশ নামের এক ল্যাব টেকনিশিয়ান। রোগীকে ব্যবস্থাপত্র দেয়ার বৈধ কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সনদপত্র না থাকলেও মিরসরাই পৌর সদরের মিরসরাই বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের দক্ষিণ পার্শ্বস্থ মাস্টার মেডিকেল ফার্মেসির পেছনে চেম্বারে বসে দেদার রোগী দেখছেন তিনি। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রুহি দাশ মিরসরাই সদরের ভার্ক মা ও শিশু হাসপাতালের ল্যাব টেকনিশিয়ান। রোগীর কাছ থেকে ফি বাবদ ১০০ টাকা নিলেও রোগীকে ব্যবস্থাপত্র দেন তিনি সাদা কাগজে। সেই ব্যবস্থাপত্রে লেখা থাকে না ডাক্তারের নাম ও ডিগ্রি। এ ছাড়া রোগীর ওই ব্যবস্থাপত্রে লেখে দেয়া হয় অনেকগুলো রক্ত পরীক্ষার নাম। ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সেই পরীক্ষাগুলো করতে গিয়ে ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছেন সাধারণ রোগীরা।
সরেজমিন ওই ফার্মেসির চেম্বারে গত রোববার সাড়ে ১১টায় গিয়ে দেখা যায়, রুহি দাশ ডাক্তার সেজে ষাটোর্ধ এক রোগীর ব্যবস্থাপত্র লিখছেন। কিছুক্ষণ পর ওই রোগী চেম্বার থেকে এলে রোগীর কাছ থেকে রুহি দাশের দেয়া ব্যবস্থাপত্রটি নিয়ে দেখা যায়, একটি সাদা কাগজে চার ধরনের ওষুধ লিখে দেয়া হয়েছে। ব্যবস্থাপত্রে ডাক্তারের নাম ও ডিগ্রি লেখা নেই, আছে শুধু একটি দুর্বোধ্য স্বাক্ষর! তাছাড়া ওই রোগীর ব্যবস্থাপত্রে লিখে দেয়া হয়েছে কয়েকটি টেস্ট। রোগীর ব্যবস্থাপত্রে ডাক্তারের নাম ও পদবি কেন লিখা নেই জানতে চাইলে রুহি দাশ আমার সংবাদকে বলেন, আমি রোগীটিকে গরিব হিসেবে ব্যবস্থাপত্র লিখে দিয়েছি। তাই ব্যবস্থাপত্রে কোনো নাম লেখা হয়নি। আমার নামে ছাপানো প্যাড আছে, এই মুহূর্তে নেই কিন্তু পরে দেখাতে পারবো।
এ সময় রুহি দাশের কাছে ডাক্তার হিসেবে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সনদপত্র আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার কাছে চট্টগ্রামস্থ ‘কন্টিনেন্টাল ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল টেকনোলজি’ নামক প্রতিষ্ঠান থেকে এক বছর মেয়াদি প্যারামেডিকেল কোর্সের সনদপত্র আছে। এ সময় তাকে ওই সনদপত্রটি দেখানোর জন্য বলা হলে অনেকক্ষণ সময় নিয়েও তিনি এই সংক্রান্ত কোনো সনদপত্র দেখাতে পারেননি। রুহি দাশ ডাক্তার কিনা জানতে চাইলে কন্টিনেন্টাল ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল টেকনোলজির পরিচালক ডা. সরোয়ার আলম আমার সংবাদ কে জানান, রুহি দাশ আমাদের প্রতিষ্ঠান থেকে যে কোর্স করেছে তাতে ডাক্তার হয়ে রোগী দেখার কোনো সুযোগ নেই। তার ডাক্তার সেজে রোগী দেখা অবৈধ।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে ‘ভার্ক’ এর চট্টগ্রাম এরিয়া কোর্ডিনেটর আলহাজ মিয়া বলেন, রুহি দাশ মিরসরাই সদরের ভার্ক মা ও শিশু হাসপাতালের ল্যাব টেকনিশিয়ান। রুহি দাশ ডাক্তার নন। সে ভার্ক হাসপাতালের বাইরে কোথাও গিয়ে ডাক্তার সেজে রোগীদের সাথে প্রতারণা করলে সেই দায়-দায়িত্ব আমরা নেবো না। জানতে চাইলে রুহি দাশের চেম্বারে আসা রোগী খুরশিদ আলম (৬০) বলেন, ভাই আসল-নকল ডাক্তার চেনার ক্ষমতা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের নেই। ওই চেম্বারে ডাক্তার আছে জেনেই আমি শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে রুহি দাশের কাছে গিয়েছিলাম। এখন শুনছি উনি ডাক্তার নন। আমাদের তো এই বিষয়ে কিছু করার নেই, আমরা অসহায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গাইনি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার বলেন, দুই বছর আগে এই রুহি দাশ আমার স্বাক্ষর নকল করে একটি হাসপাতালে আল্ট্রাসনোগ্রাফি করা শুরু করেছিলো। পরে বিষয়টি আমি জানতে পেরে তাকে সর্তক করেছিলাম। এ ছাড়া তার ব্যবস্থাপত্রে দেয়া ওষুধের অতিরিক্ত মাত্রার কারণে একটি শিশুর শারীরিক অবস্থা খারাপ হয়ে গিয়েছিলো, আমি বিষয়টি জানার পর তাকে এই ধরনের কাজ না করার জন্য বলেছিলাম।
এ ব্যাপারে মিরসরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সৈয়দ নুরুল আফছার বলেন, একজন ল্যাব টেকনিশিয়ান কোনোভাবেই ডাক্তার সেজে রোগীকে ব্যবস্থাপত্র দিতে পারে না। এটা অবৈধ কাজ। উপজেলা প্রশাসন চাইলে এই বিষয়ে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারে। এই বিষয়ে মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুহুল আমীন বলেন, এভাবে রোগী দেখা অবৈধ। বিষয়টি আমি দ্রুত খতিয়ে দেখবো। প্রয়োজনে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সূত্র : দৈনিক আমার সংবাদ