শনিবার ২৮শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ইং ১৬ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ:
লক্ষ্মীপুরে আগুনে পুড়ে ৯ দোকান ছাই, ৭৫ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি মানবিক ও নিরাপদ বাংলাদেশ গঠনে সবার সহযোগিতা চাই নবনির্বাচিত ২৯৭ সংসদ সদস্যের গেজেট প্রকাশ নির্বাচনে ভোটের বক্স নিয়ে যাবে নদীর দিকে, আশঙ্কা জেএসডি নেতার ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির মহিমান্বিত রজনী-শবে বরাত জামায়াত ক্ষমতায় এলে দেশ পাকিস্তান হয়ে যাবে : ফজলুর রহমান লক্ষ্মীপুরে ৬ সিলসহ ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার : বিএনপি-জামায়াত প্রার্থীর পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন যাদের জন্য দেশে আসতে পেরেছেন, তারা জুলাইয়ের অবদান অস্বীকার করছেন : ডা. শফিকুর রহমান লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জে নিখোঁজের ৭দিন পর কলেজ ছাত্রের লাশ উদ্ধার লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জে যৌথবাহিনীর অভিযানে অস্ত্রসহ শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘চিতা’ গ্রেপ্তার

বড় ভাইদের আশীর্বাদে বেপরোয়া কিশোররা

আকাশবার্তা ডেস্ক :


স্কুলকে কেন্দ্র করে প্রথমে ঘটে পরিচয়। এরপর বাসার দূরত্ব বুঝে গড়ে ওঠে বন্ধুত্ব। এরই মাঝে তথ্য প্রযুক্তিসহ নানা বিষয় নিয়ে আলাপ,পশ্চিমা ধ্যান ধারণার বিষয় নিয়ে মতবিনিময়। একপর্যায়ে নিজেদের মধ্যে বিশ্বাস এবং আস্থার জায়গা সৃষ্টি হয়। এরপর চিন্তা বা মতের মিল হলেই কয়েকজন মিলে গড়ে ওঠে গ্রুপ, কিশোর গ্যাং। বেশির ভাগ গ্রুপ এভাবেই তৈরি হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক ‘বড় ভাই’ দের আশীর্বাদ এই কিশোরদের করে তুলছে বেপরোয়া। এদের আবেগ যেমন বেশি, অভিমানটাও প্রচুর। দুইয়ে মিলে নিজেরাই এক অনিশ্চিত জগতে বেড়ে উঠছে , যা সমাজের জন্য এক অশনি সংকেত। গত দুই দিন নগরীর চেরাগীর মোড়, সিআরবি, লালখান বাজার ইস্পাহানি মোড়, জিইসির মোড়সহ কয়েকটি আড্ডায় উঠতি কিশোর তরুণদের সাথে আলাপে উঠে আসে ভয়ঙ্কর তথ্য।

তাদের কাছে যা ‘জাস্ট এনজয়’, তা অন্য অনেকের কাছে যে সাক্ষাৎ মৃত্যু তা বুঝার অনুভূতিটুকুও নেই তাদের। কুঁড়ি থেকে কলি হয়ে ফুল ফোটার আগেই তারা জড়িয়ে পড়েছে অপরাধ কর্মে। পাড়ায়–মহল্লায় চলছে তাদের দাপট। কেউ কেউ আবার রাজনৈতিক দলের নাম ভাঙিয়ে এসব অপকর্ম করছে। বিষয়টির সাথে একমত পোষণ করেন সিএমপি কমিশনার মো: ইকবাল হায়দার। তিনি আজাদীকে বলেন, কেবল আইন প্রয়োগ করে এ অপরাধ প্রবণতা রোধ করা যাবে না। সামাজিক সচেতনতা জরুরি। এ নগরীতে আমরা যারা বাস করি তাদের একজনের সাথে আরেকজনের রক্তের সম্পর্ক না থাকতে পারে, সামাজিক সম্পর্ক আছে। সেহেতু আমাদের সামাজিক কিছু দায়িত্বও আছে। অপকর্মের প্রতিকারে সামাজিক সচেতনতার গুরুত্ব অনেক বেশি। তিনি আরো বলেন, এদের ক্ষেত্রে আমরা যে কয়েকটি বিষয় লক্ষ্য করছি, তা হলো মা বাবা বাচ্চাদের গাইড করে না। বেকারত্ব, অশিক্ষা এবং মাদকাসক্তি নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। এটা একটা সামাজিক সংকট।

গত শনিবার দুপুরে জিইসির মোড়ে একটি ফাস্ট ফুডের দোকানে জিসান (ছদ্মনাম) নামে এক কিশোর আলাপচ্ছলে জানায়,আবাসিক এলাকায় তুলনামুলক নিরিবিলি সড়ক ও গলির মোড় এবং নির্দিষ্ট কিছু জায়গা বেছে নিয়ে তারা দিনের বেলা নির্ধারিত সময়ে আড্ডা দেয় এবং মতবিনিময় করে। এত অল্প বয়সে অপরাধ করার মত তৎপরতা তাদের কেন – এ প্রশ্নের জবাবে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের এই ছাত্র বলে, ‘ভয়ঙ্কর রূপ আমরা সব সময় ধারণ করি না। বিশেষ করে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার তথা এলাকায় তাদের ওপর কেউ অন্যায় হস্তক্ষেপ করলে, প্রেমঘটিত কারণে কোন গ্রুপের সঙ্গে দ্বন্দ্ব হলে কেবল সে েতে্রই টার্গেট করা হয়। তাদের গ্রুপে ২০ জনের মতো সদস্য আছে। এদের প্রত্যেকেই বিভিন্ন নামী–দামি কিংবা ইলিংশ মিডিয়াম স্কুলের ছাত্র।

সিএমপির একটি সূত্র জানিয়েছে, গত শুক্রবার পুলিশি চেকপোস্টে পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়া কিশোররা প্রতিপক্ষ গ্রুপকে শায়েস্তা করতে পিস্তল নিয়ে যাচ্ছিল বলে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে। সোলায়মান নামে এক ব্যক্তির নেতৃত্বে ডিএক্স গ্রুপের সদস্য তারা। প্রিমিয়ার ভার্সিটির ছাত্র সোহেল হত্যার অন্যতম আসামি এই সোলায়মান। প্রাথমিকভাবে পুলিশ জানিয়েছে ক্যান্টনমেন্ট স্কুলের একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে তারা একটি বড় ধরনের অপরাধ সংগঠিত করার জন্য যাচ্ছিল। সূত্র আরো জানায় ছাত্রলীগের পরিচয়ে চলে, এমন একজনের নেতৃত্বে নগরীর সিআরবি এলাকায় প্রতিপক্ষের উপর হামলা করতে যাচ্ছিল মোট ১০ জন। যাবার পথে পুলিশের মুখোমুখি হলে যুবলীগ কর্মী খোকন গুলি ছুঁড়ে। নগরীর ৮ নম্বর ষোলশহর ওয়ার্ডের বিতর্কিত দুই যুবলীগ নেতা ঘটনায় জড়িতদের ‘বড় ভাই’ হিসেবে পরিচিত। পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। তবে পুলিশ কর্মকর্তাদের কেউই এসব বিষয়ে সরাসরি মুখে খোলেননি।

ইতোপূর্বেও ‘বড়ভাই’দের বেঁচে যাওয়ার দৃষ্টান্ত পাওয়া গেছে। গত ১৬ জানুয়ারি নগরীর জামালখান এলাকায় কলেজিয়েট স্কুলের মেধাবী ছাত্র আদনানকে ছুরিকাঘাতে খুন করা হয়। তার বাবা প্রকৌশলী আখতারুল আজম বাদী হয়ে ১৮ জানুয়ারি কোতোয়ালি থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। আদনান হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ পাঁচজনকে গ্রেফতার করে। আটক পাঁচ কিশোর হলো মইন খান, এখলাছ উদ্দিন আরমান, সাব্বির খান, আবদুল্লাহ আল সাঈদ ও মুনতাছির মোস্তফা। তারা সবাই নগরীর চন্দনপুরা এলাকার যুবলীগ নেতা আবদুর রউফের অনুসারী। আদনান খুনের নেপথ্যের সেই বড় ভাইরা আড়ালেই রয়ে গেছে। ঠিক যেন পূর্বেকার ঘটনাগুলোর পুন: মঞ্চায়ন। পুলিশের পক্ষ থেকেও যা বলা হচ্ছে, সেসব আগের ঘটনাগুলোর পর অসংখ্যবার বলেছেন কর্মকর্তাগণ। কখনো বলা হচ্ছে, চেষ্টার ত্রুটি নেই। কখনো আবার বলা হচ্ছে এ মামলায় যাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাচ্ছে, প্রত্যেকেই ধরা পড়বে। তাতেই অনুধাবন করতে কষ্ট হয় না যে আলোচিত বড় ভাইদের শঙ্কার কোন কারণই নেই!

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পাড়া ভিত্তিক এই কিশোর গ্যাংভুক্তদের ছত্রছায়ায় রয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের এলাকাভিত্তিক নেতা উপনেতারা। কলেজিয়েট স্কুলের মেধাবি ছাত্র আদনান ইসফার (১৫) হত্যার পর থেকে গ্যাং কালচার কিংবা বড় ভাইদের হাতিয়ার হয়ে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে। আদনান ইসফার হত্যায় জড়িত আরমান, সাব্বির, মুনতাসির, মহিম ও আবু সাঈদ নিজেদের ছাত্রলীগের কর্মী পরিচয় দেয়।

তারা গ্রেপ্তারের পর পুলিশকে প্রায় অর্ধশত কিশোর গ্যাং এর তথ্য দেন বলে জানান চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার (দক্ষিণ) শাহ মোহম্মদ আবদুর রউফ। এলাকা ভিত্তিক বখাটেদের তালিকা তৈরির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, চট্টগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন উচ্চ বিদ্যালয়, কলেজিয়েট স্কুল,কাজেম আলী স্কুল এন্ড কলেজ, বাকলিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, হাজেরা তজু উচ্চ বিদ্যালয়, নাসিরাবাদ সরকারি হাই স্কুলসহ সরকারি–বেসরকারি বিভিন্ন স্কুলে বিভিন্ন নামে এসব কিশোর গ্যাং গড়ে উঠছে।

পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে সন্ধ্যার পরে নগরীর স্টেশন রোড, বিআরটিসি মোড়, কদমতলী, চকবাজার, মেডিকেল হোস্টেল, শিল্পকলা একাডেমি, সিআরবি, খুলশি, ফয়েস লেক,ডেবারপার, চান্দগাঁও শমসের পাড়া, ফরিদের পাড়া, আগ্রাবাদ সিজিএস কলোনি, সিডিএ, ছোটপুল, হালিশহর, বন্দর কলোনি ও পতেঙ্গার বেশ কয়েকটি এলাকায় মাদক বেচাকেনাসহ মোটরসাইকেল ও সাইকেল ছিনতাই, গান–বাজনা, খেলার মাঠ, ডান্স ও ডিজে পার্টি, ক্লাবের আড্ডাসহ বেশ কিছু বিষয় নিয়ন্ত্রণে মরিয়া কিশোর গ্যাং চক্র। নিজ এলাকা ছাড়িয়ে অনেক সময় তারা নগরীর বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে নানা অপরাধ কর্মকান্ড চালিয়ে থাকে। এরকম নগরীর ১৬ থানা এলাকায় প্রায় অর্ধশত কিশোর গ্যাং চক্রের তথ্য পুলিশের হাতে এসেছে বলে জানান তিনি।

নগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক মোহাম্মদ মোহসিন আজাদীকে বলেন, রাজনৈতিক সমর্থন, বিপুল অর্থপ্রাপ্তি, এলাকায় প্রভাব প্রতিপত্তির কারণে এসব কিশোর গ্যাং গ্রুপের উত্থান। তারা সামান্য কথা কাটাকাটিতে একজন অন্যজনকে চিৎকার করে মোবাইলে ফোন দেয়। মুহূর্তের মধ্যে সদলবলে হাজির হয়। এরপর চলে প্রতিপক্ষের ওপর হামলা, গাড়ি ভাংচুর এমনকি দোকানপাট ভাংচুর। কোনও এক জায়গায় বসা নিয়ে কথিত বড়ভাইদের সঙ্গে ছোটভাইদের কথা কাটাকাটি থেকেও ঘটে যায় বড় ধরণের সংঘর্ষ।

সূত্রমতে, নগরীর সিআরবি এলাকায় এসে যুবলীগ–ছাত্রলীগ নামধারী একটি গ্রুপের মারধরের শিকার হন ঘটনায় জড়িত ১০ জনের একজন। মারধরের বিচার দিতে গিয়ে সে আরেক দফা অপমানের শিকার হয়। ওই ঘটনার প্রতিশোধ নিতে প্রতিপক্ষের উপর হামলার জন্য সে বাকিদের জড়ো করে যাচ্ছিল সিআরবি এলাকায়। মূলত ছাত্রলীগ নামধারী ওই তরুণই ঘটনার নেতৃত্বদাতা।

এমইএস কলেজে পড়ালেখানা করলেও ওই তরুণ এই কলেজকেন্দ্রিক রাজনীতিতে সক্রিয়। উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। তবে নগর, কলেজ কিংবা ওয়ার্ডভিত্তিক ছাত্রলীগের কোন কমিটিতে তার নাম নেই। সূত্রমতে, যে খোকন গুলি করেছে, সে জিইসি–ষোলশহর এলাকায় যুবলীগ কর্মী হিসেবে পরিচিত। প্রায় ২৪ বছর বয়সী খোকনের বিরুদ্ধে ছিনতাইসহ বিভিন্ন অভিযোগে একাধিক মামলা আছে।

এদিকে নগরীর ১৬ থানায় কিশোর অপরাদীদের তালিকা তৈরির জোর তৎপরতা চলছে দীর্ঘদিন ধরে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে কোন একটি ঘটনা ঘটার পর কিছুদিন তৎপরতা চলে দুর্বার গতিতে। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই তালিকা ফাইল বন্দী হয়ে পড়ে থাকে । গত ১৬ জানুয়ারি জামালখানে কলেজিয়েট স্কুলের মেধাবী শিক্ষার্থী আদনান ইসফার খুন হওয়ার পর নতুন উদ্যমে শুরু হয়েছিল তালিকা তৈরির কাজ। সিএমপি কমিশনার এক সপ্তাহ সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন তালিকা তৈরি করে পাঠানোর জন্য। তালিকায় কোন থানায় কত জন কিশোর অপরাধী রয়েছে, তারা কখন কোথায় অবস্থান করে এ ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য দিতে বলা হয়। নগরীর কয়েকটি থানায় এ কাজটি সফলভাবে শেষ করা হলেও, অন্যান্য থানাগুলো ‘দিচ্ছি’ ‘দেবো’ করতে করতে সমন্বিত তালিকা আর করা হয় নি। গত শুক্রবার কিশোর অপরাধীদের গুলিতে কর্তব্যরত পুরিশ কর্মকর্তা আহতের ঘটনায় নতুন করে তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে।

সমাজ বিজ্ঞানী ড: অনুপম সেন আজাদীকে বলেন, চট্টগ্রামে বিশেষভাবে যে কালচার গড়ে উঠছে , সেটা হল বড় ভাই কালচার। এটাকে দমন করতে হবে। কিশোররা রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকলেও এরা সত্যিকারের রাজনীতি করেনা, এরা রাজনীতির আর্দশ কি সেটাও বুজেনা। কারণ ওরা অনুকরণ করে ওদের ঐসব বড় ভাইদেরকে, যারা আসলে প্রায় মূর্খ বললে চলে। এদেরকে কঠোর ভাবে দমন করে এবং সাংস্কৃতিক ও আর্দশিক চর্চার উপর জোর বাড়ানোর মধ্য দিয়ে এর প্রতিকার সম্ভব বলে জানান এই সমাজ বিজ্ঞানী।

সূত্র : দৈনিক আজাদী

     এই বিভাগের আরও সংবাদ

আর্কাইভ

ফেব্রুয়ারি ২০২৬
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
« জানুয়ারি    
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮