আকাশবার্তা ডেস্ক :
বিশেষ কোয়ারেন্টাইন শেষে উহানফেরত তিন শতাধিক যাত্রী বাড়ি ফিরেছে। সবাই সুস্থ। এ খবর স্বস্তির। ইতোমধ্যে রাজশাহী ও বরগুনায় চীনফেরত দুজন জ্বর-ঠাণ্ডা নিয়ে ভর্তি হয়েছেন।
এতে নতুন করে আতঙ্ক বেড়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে গুজবও মাথাচাড়া দিচ্ছে। করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকে গুজব প্রতিরোধে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে সরকার।
এদিকে চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী দেশে প্রবেশ করছেন। তাদের সবাইকে আরও সতর্কতার সঙ্গে স্ক্রিনিং করে প্রবেশ করানো প্রয়োজন। সেই সাথে চীনের হুবেই প্রদেশ থেকে আর কাউকে ফিরিয়ে না আনার পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত।
তবে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক জানিয়েছেন, চীন কিংবা সিঙ্গাপুর থেকে ফেরা মানেই করোনা আতঙ্ক নয়। তারা নিরাপদ আছেন।
এখনো আতঙ্কিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। সতর্কতা হিসেবে চীন, সিঙ্গাপুরসহ যেসব দেশে করোনা ভাইরাস ছড়িয়েছে সেসব দেশ থেকে ফেরা যাত্রীদের বাসায় কোয়ারেন্টাইন করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
এদিকে করোনা ভাইরাস নিয়ে রাজধানীর মহাখালীতে আইইডিসিআরের কার্যালয়ে নিয়মিত ব্রিফিংয়ে পরিচালক মীরজাদি সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, এখন পর্যন্ত আমরা ৬৬ জনের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করেছি, কারো মধ্যেই করোনার উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।
এতে বলা যেতে পারে, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত কোনো করোনা আক্রান্ত রোগী নেই। চীন কিংবা সিঙ্গাপুর ফেরত যাত্রী কিন্তু করোনা সন্দেহভাজন নয়। এটা আমরা বারবার বলছি। তারপরও চীন কিংবা সিঙ্গাপুর থেকে যারা ফেরত আসছেন, তারা অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন।
তিনি বলেন, চীনের সব প্রদেশে কিন্তু এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়নি; সুতরাং চীন থেকে এলেই যে তারা করোনা আক্রান্ত রোগী হবে, এমন কোনো বিষয় নেই।
এখন যেহেতু চীনের সঙ্গে সিঙ্গাপুর যুক্ত হয়েছে এবং সেখানে পাঁচজন বাংলাদেশি আক্রান্ত হয়েছেন, সে কারণে সিঙ্গাপুর ফেরতদের নিয়েও বিভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছে। সিঙ্গাপুরে যে পাঁচজন বাংলাদেশি নাগরিক আক্রান্ত হয়েছেন তারা কিন্তু এক জায়গায় কাজ করেন।
এরা ছাড়া অন্য কোথাও যারা কাজ করেন, বা বাংলাদেশ থেকে ভ্রমণে গিয়েছেন; তারাও কিন্তু আক্রান্তের তালিকায় নেই। সিঙ্গাপুর থেকে এলেই তাদের নিয়ে ভীত হতে হবে, কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে, এমন পরিস্থিতি কিন্তু এখন পর্যন্ত দাঁড়ায়নি। আমরা কেবল অতিরিক্ত সতর্কতা হিসেবে নিজ দায়িত্বে বাসার ভেতরে কোয়ারেন্টাইনে থাকার অনুরোধ জানিয়েছি।
জরুরি প্রয়োজন না হলে বাসার বাইরে তারা কম যাবেন। জনসমাগম হয় এ রকম জায়গা এড়িয়ে চলবেন। যদি বাসার বাইরে যেতে হয় তাহলে মাস্ক ব্যবহার করবেন। এই সহজ বিষয়গুলো উনারা মেনে চলবেন। তাহলে কিন্তু আমাদের ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকবে না।
এসময় তিনি গুজবে কান না দেয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, পত্রপত্রিকায় আমরা দেখেছি যে, বিদেশ থেকে আগত এক যাত্রীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হবে শুনে নাকি তার পরিবারের একজন মারা গেছেন। এ ধরনের গুজবে যে কতখানি ক্ষতি হতে পারে এর থেকে বড় উদাহরণ আর হয় না।
এদিকে গতকাল সোমবার সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে চীনা রাষ্ট্রদূত লি জিমিং বলেন, ‘ঝুঁকি’ বিবেচনায় নিয়ে দেশের এবং জনগণের স্বার্থ চিন্তা করে হুবেই প্রদেশে থাকা ১৭১ জনকে এখনই ফেরত আনার দরকার নেই।
কারণ ভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তারা যেখানে আছেন, সেখানে সুরক্ষিতই আছেন। সেখানে যে ফ্লাইট তাদের আনতে যাবে, ওই প্লেন এবং তার পাইলট-ক্রুদের এখন অন্য কোনো দেশ ঢুকতে দেবে না।
বাংলাদেশিদের ফেরানোর ক্ষেত্রে চীনের অনুমতি মিলছে না বলে খবর ছড়ানোর বিষয়ে রাষ্ট্রদূত বলেন, অনুমতি কোনো সমস্যা নয়। সমস্যা হলো টেকনিক্যাল। ফ্লাইটের পাইলট-ক্রুরাও এই টেকনিক্যাল জটিলতায় পড়বেন।
তিনি বলেন, করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় চীনে হ্যান্ড স্যানিটাইজার, মাস্ক, গাউন ও হাতমোজা পাঠাচ্ছে বাংলাদেশ। সেইসাথে চীন থেকে আগামী দুদিনের মধ্যে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ৫০০টি স্বাস্থ্য পরীক্ষার উপকরণ (কিট) আসছে।
করোনা ভাইরাস বিষয়ে বাংলাদেশের গণমাধ্যম বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করছে জানিয়ে রাষ্ট্রদূত এজন্য সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানান।
এসময় তিনি বলেন, করোনা ভাইরাস নিয়ে নানা গুজব বিভিন্ন মিডিয়ায় ছড়ানো হচ্ছে। কোনো গুজবে কান দেয়া যাবে না।
দুইজন জ্বর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি : করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত সন্দেহে নীলফামারীর উত্তরা ইপিজেডে জিংজং (২৯) নামের এক চীনা নারী শ্রমিককে রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। গত রোববার রমেক হাসপাতালের আইসোলেশন বিভাগে ভর্তি করা হয়।
চিকিৎসকরা জানান, জিংজং জ্বর, সর্দি ও বুকে ব্যথা নিয়ে গত রোববার দুপুরে রমেক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে সহকর্মীরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন।
বর্তমানে তিনি হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডের করোনা ইউনিটে রয়েছেন। তাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। গত ৪ ফেব্রুয়ারি জিংজং চীন থেকে বাংলাদেশে আসেন।
তিনি নীলফামারীর উত্তরা ইপিজেডে চাইনিজ একটি কোম্পানিতে কর্মরত। রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) প্রতিনিধি দল তার নমুনা পরীক্ষার জন্য সংগ্রহ করেছেন। পরীক্ষা শেষে তার বিষয়ে জানা যাবে।
এদিকে বরগুনায় চীনফেরত এক শিক্ষার্থী জ্বর নিয়ে একই দিনে (রোববার) বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য ইতোমধ্যে তার শরীরের নমুনাও সংগ্রহ করা হয়েছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ওই শিক্ষার্থী জ্বর নিয়ে ভর্তি হয়েছেন।
চীনে করোনা ভাইরাসের উৎপত্তিস্থল হুবেই প্রদেশ নয়, অন্য একটি প্রদেশ থেকে ৩৬ ঘণ্টার ট্রেনযাত্রা করে তিনি চীনের বিমানবন্দরে পৌঁছান এবং সেখান থেকে বিমানে করে গত শনিবার দেশে আসেন।
বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক সোহরাব হোসেন বলেন, চীন থেকে আসা এক শিক্ষার্থী গত রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
১০০ ডিগ্রির নিচে তার জ্বর। আমরা তাকে বিশেষ পর্যবেক্ষণে রেখেছি। তাকে একটি আলাদা ভবনে রাখা হয়েছে। করোনা ভাইরাস পরীক্ষার উপকরণ এই হাসপাতালে না থাকায় ওই শিক্ষার্থী করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত কি না, তা জানা যায়নি। নমুনা সংগ্রহ করে আইইডিসিআরে পাঠানো হয়েছে।